একটি না বলা গল্প: সাধারণ মানুষের নীরব সংগ্রাম
ভূমিকা
আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের জীবন গল্পে ভরা—কিন্তু সেই গল্প কেউ শোনে না।তারা খবরের কাগজে আসে না, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় না, কিংবা কোনো বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলার সুযোগও পায় না। তবু এই মানুষগুলোর জীবনেই লুকিয়ে থাকে সমাজের সবচেয়ে বাস্তব ছবি।
এই লেখাটি তেমনই একজন সাধারণ মানুষের গল্প।
কোনো পরিচিত নাম নেই, কোনো বিশেষ পরিচয় নেই।
তার জীবন প্রতিদিন শুরু হয় দায়িত্ব দিয়ে, আর শেষ হয় নীরব ক্লান্তিতে।
একজন সাধারণ মানুষের সকাল
ভোর পাঁচটার আজানের শব্দ ভেসে আসতেই তার ঘুম ভেঙে যায়।
অ্যালার্মের প্রয়োজন পড়ে না—অভ্যাসই তাকে জাগিয়ে তোলে।
ছোট ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখে নেয়—পাঁচটা পনেরো।
আর দেরি করা যাবে না।
ঘরে তখনো সবাই ঘুমিয়ে—স্ত্রী, দুই সন্তান।
সবার মুখেই দিনের আগের ক্লান্তির ছাপ।
তিনি খুব ধীরে উঠে পড়েন, যেন কারো ঘুম না ভাঙে।
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের মুখটাই মাঝে মাঝে অপরিচিত মনে হয়।
চোখের নিচে কালচে দাগ, কপালে ভাঁজ।
বয়স যেন সময়ের থেকেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
দায়িত্বের ভার
এই ঘরটার প্রতিটি খরচ তার কাঁধে।
বাড়িভাড়া, বাজার, সন্তানের স্কুল ফি, চিকিৎসা—সব কিছুর শেষ ভরসা তার আয়।
আয় খুব বেশি নয়।
কিন্তু এই সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করে চারটি জীবন।
তিনি জানেন, অভিযোগ করলে দায়িত্ব কমে না—বরং আত্মসম্মানটাই কমে যায়।
তাই তিনি অভিযোগ করেন না।
চুপচাপ বহন করে যান।
যাতায়াতের যুদ্ধ
সকাল সাতটার বাস মানেই যুদ্ধ।
ঠেলাঠেলি, গরম, দাঁড়িয়ে থাকা—এই যুদ্ধ দিয়েই তার দিনের শুরু।
এই বাসেই তিনি প্রতিদিন সমাজকে দেখেন—
ছাত্র, শ্রমিক, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ।
সবাই যেন নিজের নিজের বোঝা নিয়ে একই গন্তব্যে ছুটছে।
কেউ কারো দিকে তাকায় না।
সবাই নিজের সমস্যায় ডুবে থাকে।
কর্মজীবনের নীরবতা
তিনি কোনো বড় কর্পোরেট অফিসে কাজ করেন না।
ঢাকার এক ব্যস্ত এলাকায় ছোট একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
বেতন খুব বেশি নয়, কিন্তু নিয়মিত।
আর নিয়মিত মানেই তার কাছে নিরাপত্তা।
দিনভর কাজ, হিসাব, মানুষের কথা শোনা—সবকিছু করেই দিন শেষ হয়ে যায়।
কেউ তার কাজের প্রশংসা করে না।
কেউ তার কষ্ট বোঝে না।
তবু তিনি কাজ করেন।
কারণ কাজ না করলে সংসার চলে না।
ভেতরের যুদ্ধ
সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা বাইরে নয়—ভেতরে।
মাঝে মাঝে তার মনে হয়—
এই জীবন কি শুধু দায়িত্ব পালন করেই শেষ হয়ে যাবে?
নিজের কোনো স্বপ্ন কি আর অবশিষ্ট নেই?
কিন্তু এই প্রশ্নগুলো তিনি কাউকে বলেন না।
সমাজ তাকে শিখিয়েছে—
পুরুষ মানেই শক্ত হতে হবে।
কাঁদা যাবে না, দুর্বল হওয়া যাবে না।
একটি ছোট ঘটনা, বড় উপলব্ধি
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে বসে ছিলেন তিনি।
সেদিন শরীরটা খুব খারাপ লাগছিল। মাথা ঝিমঝিম করছিল।
হঠাৎ দেখলেন, একজন বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
নিজের কষ্ট ভুলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে বসে শুধু বললেন—
“আল্লাহ তোমার ভালো করুক বাবা।”
এই কথাটুকু তার বুকের ভেতরে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
এতদিনে কেউ তাকে মানুষ হিসেবে দেখেছে—এই অনুভূতিটাই ছিল বড় পাওয়া।
বাস থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটার সময় দেখলেন,
একজন নারী একটি ছোট শিশুকে নিয়ে কাঁদছেন—
“আমার খাওয়ার কিছু নেই।”
তিনি সচ্ছল নন।
তবু পকেট থেকে দশ টাকা বের করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে হাঁটা শুরু করলেন।
সেদিনের তৃপ্তি তার মন ভরিয়ে দিয়েছিল।
বাড়ি ফেরা
রাতে বাড়ি ফিরলে বাচ্চারা দৌড়ে আসে।
তাদের হাসিটাই দিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেয়।
স্ত্রী চুপচাপ খাবার দেন।
খুব বেশি কথা হয় না।
তবু এই নীরবতার মধ্যেই আছে গভীর বোঝাপড়া।
সমাজের চোখে সাধারণ মানুষ
সমাজ তাকে আলাদা করে দেখে না।
তিনি না ধনী, না ক্ষমতাবান, না আলোচিত।
তবু সমাজের চাকা ঘোরে তার মতো মানুষের ঘামেই।
এই মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
কারণ তারা চুপচাপ দায়িত্ব পালন করে যায়।
লেখকের উপলব্ধি
এই গল্প লিখতে গিয়ে আমি বুঝেছি—
আমরা বড় বড় গল্প খুঁজি, অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলো আমাদের পাশেই থাকে।
এরা ভাইরাল না।
কিন্তু এরাই সমাজের মেরুদণ্ড।
কেন এই গল্প বলা জরুরি
এই গল্প বলা জরুরি, কারণ
এই মানুষগুলোকেই না দেখলে আমরা সমাজকে পুরোপুরি বুঝতে পারি না।
এরা ভোট দেয়,
এদের ভোটেই সরকার গঠিত হয়,
এরাই সমাজের ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
উপসংহার
এই লেখা কোনো উপদেশ নয়।
এটা শুধু একজন সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
যদি এই লেখা পড়ে আপনি আপনার পাশের মানুষটাকে একটু ভিন্ন চোখে দেখেন—
তাহলেই এই লেখার সার্থকতা।
🔹 আপনার মতামত জানান
আমরা কি এদের সঠিক মূল্য দিতে পারবো?
নাকি এভাবেই চলবে?
কমেন্টে লিখে জানান এবং এমন লেখা পেতে ব্লগটি ফলো করুন।
আমাদের জীবন।
ReplyDeleteAmazing writing
ReplyDelete