গুজব থেকে বাঁচার উপায়: কেন গুজব ছড়ায় ও কীভাবে সত্যতা যাচাই করবেন
অতীতস্মরণ: নিজের জীবনের কথা
আমার বয়স এখন প্রায় ষাট। শরীর আর আগের মতো টগবগ করে না। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিষয় যেন আরও বেড়েছে—অতীতের স্মৃতি।
কোনো ঘটনা সামনে এলে হঠাৎ করেই অতীতের অনেক ঘটনা মনে পড়ে যায়। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করি—এই ঘটনার সঙ্গে কি আমার জীবনের কোনো পুরোনো ঘটনার মিল আছে?
পুরোনো সেই ঘটনাগুলো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে আমি এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পাই। সেটাকেই আমি বলি “অতীতস্মরণ”।
হয়তো আমার এই স্মৃতিচারণে কারও বড় কোনো উপকার হবে না। কিন্তু কারও ক্ষতি তো হচ্ছে না। আর যদি কোনো পাঠক আমার অভিজ্ঞতা থেকে সামান্য কিছু শিখতে পারেন, তাহলেই আমার লেখার সার্থকতা।
সন্ধ্যার আড্ডা ও একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস
এশার নামাজের পর এলাকার সমবয়সী কয়েকজনের সঙ্গে বসি। বন্ধু বলব কি না জানি না—তবে এটি আমাদের নিয়মিত আড্ডার জায়গা।
সেদিনের আড্ডায় আমাদের কমিটির সেক্রেটারি জামান সাহেব হঠাৎ বলে উঠলেন,
“এইমাত্র ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস আসলো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— কে দিয়েছে?
উনি বললেন,
— জানি না।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— কী লেখা?
জামান সাহেব বললেন,
“খবর এসেছে—সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। যারা ভালোবাসেন, লাইক দিন।”
উনি আরও বললেন,
“আমি এখনই লাইক দিচ্ছি।”
আমি বললাম,
— লাভ নেই, বাদ দেন।
উনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কেন?
আমি বললাম,
— সত্যিই যদি এমন বড় কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমেও খবরটি থাকার কথা। শুধু একটি অচেনা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে বিশ্বাস করার দরকার নেই।
কথাটা শুনে উনি বললেন,
— ঠিক আছে, তাহলে বাদই দেই।
সেদিনের ঘটনাটি আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখলেই সেটি সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ভূমিকম্পের গুজব
এর প্রায় এক মাস পর, ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পের পরের ঘটনা।
পরদিন এশার পর আবার আমাদের আড্ডা বসেছে। জামান সাহেব বললেন,
“ভাই, কাল রাত দুইটায় ভাগ্নে ফোন দিয়েছিল।”
আমি বললাম,
— এত রাতে?
উনি বললেন,
“বলছে নাকি রাত আড়াইটায় আবার বড় ভূমিকম্প হবে!”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— আপনি কী করলেন?
জামান সাহেব হেসে বললেন,
“আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম। বললাম—মরলে সবাই একসাথেই মরব।”
এই কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— তারপর?
জামান সাহেব বললেন,
“বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিল।”
ঘটনাটি হাসির হলেও বিষয়টি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অনুমান, ভয়ভীতি বা অযাচাইকৃত তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ঠিক কখন, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে—এ ধরনের নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
বাসার ভেতরের গুজব
সেদিন রাতে বাসায় ফিরলাম। স্ত্রী খাবার দিতে দিতে বলল,
“ফেসবুকে লেখা উঠেছে, আজ রাত দুইটায় বড় ভূমিকম্প হবে।”
আমি বললাম,
— ও জানল কীভাবে?
স্ত্রী বলল,
“ফেসবুক, ইউটিউবে তো গুরুত্বপূর্ণ খবর দেয়!”
আমি বললাম,
— ফেসবুক বা ইউটিউবে সত্যিকারের খবর যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ভুল তথ্যও ছড়াতে পারে। তাই কোনো খবর দেখলেই যাচাই না করে বিশ্বাস করা ঠিক নয়।
এরপর মজা করে বললাম,
“লাইক দিলেই যদি সব সত্য হতো, তাহলে ভোটের দরকারই পড়ত না!”
এই কথা শুনে স্ত্রী একটু মন খারাপ করে অন্য ঘরে চলে গেল।
আমি অবশ্য পরে বুঝলাম—গুজব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ঘরের মানুষের মন খারাপ করাও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়!
গুজব নতুন কিছু নয়: পুরোনো দুই স্মৃতি
গুজব বা অযাচাইকৃত খবরের সঙ্গে মানুষের পরিচয় আজকের নয়। আগে ফেসবুক ছিল না, ইউটিউব ছিল না, স্মার্টফোন ছিল না। তখনও মানুষের মুখে মুখে খবর ছড়াত।
আমার জীবনের এমন দুটি ঘটনা আজও মনে আছে।
স্মরণ–১: লবণ মজুতের হুজুগ
একসময় হঠাৎ লবণের দাম বেড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল।
সকালে স্ত্রী আমাকে বলল,
— দুই প্যাকেট লবণ নিয়ে এসো।
দোকানে গিয়ে দেখি, লবণ পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, তবে আগের তুলনায় দাম বেশি এবং সরবরাহ নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ।
কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লবণ কিনে মজুত করতে শুরু করল।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেল।
তখন যারা আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি লবণ কিনেছিলেন, তাদের অনেকেই বুঝতে পারলেন—শুধু মানুষের মুখের কথা বা অযাচাইকৃত খবর শুনে আতঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা অযৌক্তিক হতে পারে।
এই ধরনের ঘটনা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—কোনো পণ্যের দাম বা সরবরাহ নিয়ে খবর শুনলে আগে পরিস্থিতি যাচাই করা দরকার।
স্মরণ–২: বায়তুল মোকাররমের দৌড়
এরশাদের শাসনের শুরুর দিকের কথা।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় হঠাৎ দেখি, মানুষ একদিকে দৌড়াচ্ছে।
আমরাও দৌড়াতে শুরু করলাম।
কিন্তু কেন দৌড়াচ্ছি—সেটাই জানি না!
কিছুক্ষণ পর একজনকে জিজ্ঞেস করা হলো,
— ভাই, আমরা দৌড়াচ্ছি কেন?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কেউই ঠিক করে বলতে পারল না।
অর্থাৎ একজন দৌড়াচ্ছে, আরেকজন তাকে দেখে দৌড়াচ্ছে, তারপর তৃতীয়জনও যোগ দিচ্ছে। কিন্তু দৌড়ানোর আসল কারণটি কেউ জানে না।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কখনো কখনো একই ঘটনা ঘটে।
একজন একটি পোস্ট শেয়ার করেন। আরেকজন যাচাই না করেই সেটি শেয়ার করেন। তারপর আরও অনেকে একই কাজ করেন।
একসময় মনে হয়—“এত মানুষ বলছে, তাহলে নিশ্চয়ই সত্য!”
কিন্তু সংখ্যাই সবসময় সত্যের প্রমাণ নয়।
গুজব কেন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে?
মানুষ সাধারণত নতুন, চমকপ্রদ বা ভয় তৈরি করে এমন খবর দ্রুত অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে আগ্রহী হয়।
বিশেষ করে কোনো খবর যদি—
খুব ভয়ংকর মনে হয়,
খুব আশ্চর্যজনক হয়,
পরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্কিত হয়,
জরুরি বলে মনে হয়,
অথবা “এখনই সবাইকে জানিয়ে দিন” ধরনের ভাষায় লেখা হয়,
তাহলে মানুষ অনেক সময় যাচাই করার আগেই সেটি অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটি ভুল তথ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
তাই কোনো খবর অনেকবার দেখা যাচ্ছে—এটিই তার সত্যতার প্রমাণ নয়।
গুজব মানুষের স্বভাব?
একদিন এক বন্ধুকে বলেছিলাম—মানুষ গুজবে সহজেই বিশ্বাস করে।
সে আমাকে একটা মজার উদাহরণ দেখাল।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সে দূরের একটি নারকেল গাছের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর একজন এসে জিজ্ঞেস করল,
— কী দেখছেন?
সে কোনো উত্তর দিল না।
আরও কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেল।
দশ মিনিটের মধ্যে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হলো। পনেরো মিনিটের মধ্যে প্রায় ছোটখাটো জটলা তৈরি হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত একজন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— ভাই, আসলে কী হয়েছে?
বন্ধু তখন বলল,
“ওই গাছে একটা কাক দেখতেছি।”
সবাই বলল,
— ধুর!
তারপর যে যার মতো চলে গেল।
ঘটনাটি মজার হলেও এর মধ্যে একটা শিক্ষা আছে।
মানুষ অনেক সময় কোনো ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি না জেনেই অন্যের আচরণ অনুসরণ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাই “অনেকে শেয়ার করেছে”, “অনেক লাইক পড়েছে” বা “সবাই বলছে”—এসব দেখে কোনো খবর সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
গুজব দেখলে কী করবেন?
কোনো খবর সন্দেহজনক মনে হলে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
১. সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করবেন না
প্রথমে থামুন। খবরটি সত্য কি না দেখুন।
২. নির্ভরযোগ্য উৎসে যাচাই করুন
গুরুত্বপূর্ণ খবর হলে একাধিক বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য দেখুন।
৩. খবরের তারিখ দেখুন
অনেক পুরোনো খবর নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৪. ছবির ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন
পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার ছবি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাই শুধু ছবি দেখেই কোনো ঘটনা সত্য ধরে নেবেন না।
৫. ভয় বা উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেবেন না
ভূমিকম্প, রোগ, মৃত্যু, পণ্যের দাম, রাজনৈতিক ঘটনা বা অন্য কোনো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে খবর পেলে আগে যাচাই করুন।
৬. “চিলে কান নিয়ে গেছে” শুনে চিলের পেছনে ছুটবেন না
বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে—“চিলে কান নিয়ে গেছে।”
কান সত্যিই গেছে কি না না দেখে যদি চিলের পেছনে দৌড়াই, তাহলে হয়তো শেষে বুঝব—কান তো নিজের জায়গাতেই আছে!
তাই কোনো খবর শুনে প্রথম কাজ হওয়া উচিত—
শুনলাম → থামলাম → যাচাই করলাম → তারপর বিশ্বাস বা শেয়ার করলাম।
আমরা কি গুজব থেকে বাঁচতে পারব না?
এত বছর পরেও আমার প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি এই আধুনিক যুগেও গুজব থেকে বাঁচতে পারব না?
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।
কিন্তু প্রযুক্তি যেমন সত্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি ভুল তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে।
তাই সমস্যাটা শুধু প্রযুক্তির নয়। আমরা কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আগে গুজব মুখে মুখে ছড়াত। এখন সেটি ছড়াতে পারে একটি পোস্ট, একটি ছবি, একটি ভিডিও বা একটি মেসেজের মাধ্যমে।
তাই হয়তো গুজবকে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু গুজবের শিকার হওয়া এবং গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি আমরা অনেকটাই কমাতে পারি।
এর জন্য দরকার একটি ছোট অভ্যাস—
কোনো তথ্য দেখেই বিশ্বাস নয়; আগে যাচাই।
প্রশ্নোত্তর
❓ কোনো খবর অনেক মানুষ শেয়ার করলে কি সেটি সত্য?
👉 না। অনেক মানুষ শেয়ার করলেও তথ্যটি ভুল হতে পারে। নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা উচিত।
❓ ফেসবুকে বা ইউটিউবে কোনো খবর দেখলে কী করব?
👉 খবরের উৎস, তারিখ এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র পরীক্ষা করুন।
❓ ভূমিকম্প কখন হবে—এমন নির্দিষ্ট খবর কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বাস করা উচিত?
👉 যাচাই ছাড়া নয়। বিশেষ করে দুর্যোগ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী পোস্ট শেয়ার করার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
❓ গুজব ছড়ানো বন্ধ করার সহজ উপায় কী?
👉 যাচাই না করা কোনো খবর নিজে শেয়ার না করা এবং অন্যকেও যাচাই করতে উৎসাহিত করা।
শেষ কথা
গুজব হয়তো মানুষের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই আছে। মাধ্যম বদলেছে, গুজবের গতি বেড়েছে।
তাই গুজব থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—একটু থামা, একটু ভাবা এবং তারপর যাচাই করা।
চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে দৌড়ানোর আগে একবার নিজের কানটা দেখে নেওয়াই ভালো!
আপনার জীবনে কি কখনো কোনো গুজবের কারণে মজার, বিব্রতকর বা শিক্ষণীয় কোনো ঘটনা ঘটেছে? আপনার অভিজ্ঞতা মন্তব্যে জানাতে পারেন।
Wow! Creative writing
উত্তরমুছুন