স্মৃতির পাতায় থাকবে
| ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায়ই আমাদের বেশিরভাগ আড্ডা চলে |
১.
রাত ১১.৩০বাসায় ফিরেছি মাত্র আড্ডা দিয়ে
.এমন সময় জাহিদ ভাই ফোন করলো, বললো ,
“রশিদ ভাই একটু শেষ মাথায় সেক্রেটারি সাহেবের বাসার সামনে আসুন ।”
জাহিদের কথা কখনোই ফেলি না,কারণ রাত্র দুইটাই যদি একটা সমস্যায় পড়ে তাকে ডাক দেই, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে এসে হাজির হবে। এমন একটা লোকের ডাকে সারা না দেই কিভাবে?
আর আমরা একটা সমাজ কল্যাণ সমিতির সাথে জড়িত। সমাজের ডাকে উপস্থিত না হয়ে পারি ? জণকল্যাণ সমিতিতে লোকজন এর অভাব নাই। কিন্তু ডাক দিলে অধিকাংশকেই পাওয়া যায় না। জাহিদ
ভাই তাদের দলের না। তাই তার ডাকে না এসে পারা যায় না।
কিন্তু যখনই শেষ মাথার কথা বলল তখনই ঝামেলা মনে হলো, কারণ এইমাত্র ওখান থেকেই আসা হলো। ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায়ই আমাদের বেশিরভাগ আড্ডা চলে।
পশ্চিম দিকের শেষ মাথায় তাকানো হয়েছিল কোন কিছুই নজরে আসে নাই, তাই নতুন করে আবার অনেক রাত্রে যেতে ভালো লাগলো না,
তাই বলা হলো,
" আমি নামাজে দাঁড়াচ্ছি এখন আসাটা সম্ভব না।"
জাহিদ ভাই বললো,
" ভাই আসলে ভালো হতো। "
বলা হলো,
" নামাজে দাড়িয়ে গিয়েছি তো। এশার নামাজ ওয়াক্ত শেষের পথে, জামাতে পড়তে পারি নাই,
কারণ এতক্ষণ ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় আড্ডা দিতেছিলাম।"
যাহোক এখানে এই পর্বের সমাপ্তি ঘটলো ।
২.
আর কিছু বলা হলো না। শেষ মাথা মানে আউয়াল এর বাড়ির ওদিকে। মনে মনে ভাবা হলো, আউয়াল একজন সাহসী ছেলে গভীর রাতে বিপদের কথা বলে ডাক দিলে সাত পাচ না ভেবে সে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তবে এত উপকারী হলেও তার একটা সমস্যা, সে একটু রগ চটা। একগুয়েমি ভাব আছে, একরোখা। তার স্বভাব বিপদে ভয় ডরহীন ভাবে পাশে এসে দাঁড়ালেও, তার এই কথা না শোনা, রগচটা স্বভাবের কারণে তাকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। আড্ডা দেওয়ার সঙ্গী আখতার ভাই আর হোসেন ভাই এবং আরো অনেকে তার এই স্বভাবের কারণে এড়িয়ে চলে। না যেতে পেরে মনে মনে প্রফুল্লই হওয়াই স্বাভাবিক ।
৩.
রাত একটার সময় ব্যারিস্টার সাহেব ফোন দিল একটু অবাক হয়ে গেলাম উনার ফোন দেখে, কারণ এত রাত্রে উনি সাধারণত ফোন দেন না। অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ফোন ধরলাম। বললাম,
" আসসালামুয়ালাইকুম, কি ব্যাপার ভাই, এতো রাত্রে?"
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর এলো,
" ওয়ালাইকুম আসসালাম,ঘটনাটা কি জানেন?"
অবাক হয়ে বললাম,
" না, কি ঘটনা? যা এত রাতে আপনাকে আলোড়িত করল?
বললেন,
" আউয়াল, এডভোকেট সিদ্দিক সাহেবকে শারীরিক আঘাত করেছে।"
বললাম,
"কি বলছেন?"
উনি বললেন,
"কালকে এ ব্যাপারে একটু বসতে হবে।"
বললাম,
"ঠিক আছে।"
মনটা অশুভ আশংকায় চিন্তিত হয়ে উঠলো। জাহিদ ভাইকে ফোন দিলাম।বললাম,
"ভাই দুঃখিত কারণ নামাজ শেষ করে খেতে বসেছিলাম। প্রচন্ড খিদা লেগেছিলো। খাওয়া দাওয়া শেষ করতে করতে সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছিল। তাই, অত রাত্রে আর বের হই নাই। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল?"
ব্যারিস্টার সাহেবের ফোনের কথাটা চেপে গেলাম।
উনি বললেন,
" আউয়ালের সাথে অ্যাডভোকেট সিদ্দিক সাহেবের হাতাহাতি হয়েছে। আমি সিদ্দিক সাহেবের বিরুদ্ধে আউয়ালের পক্ষ নিয়ে এটি থামিয়েছি।"
আমি বললাম,
"সিদ্দিক সাহেব তো একজন ভদ্রলোক। উনি তো হাতাহাতি করার লোক না?"
জাহিদ ভাই বলল,
" আর বইলেন না, সিদ্দিক সাহেব রাস্তায় মোবাইলে কথা বলছিলো আর হাঁটছিলো, আউয়াল নাকি কাজ শেরে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমাচ্ছিলো। রাস্তার সাথেই তার জানালা,
তার ঘুমে ডিস্টার্ব হচ্ছে বলে, ধমক দিয়েছে। সিদ্দিক সাহেবও তার প্রতি উত্তর দিয়েছে। এরপর আউয়াল বাসা থেকে বের হয়ে তার উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। তার স্ত্রী ও এতে সঙ্গ দিয়েছে।
আমি বললাম,
" কালকে এটা নিয়ে বসবো, কিছু একটা করতে হবে। না হলে, পরে একটা সমস্যা হবে। যে করেই হোক,
এটা মিটমাট করতে হবে। "
জাহিদ ভাই বলল,
" আচ্ছা ঠিক আছে থাকবো। "
এরপরে সেক্রেটারি জামান সাহেব কে ফোন দিলাম।
সে বলল,
সিরাজগঞ্জে কাজেএসেছি,
আউয়ালের কথা জানালাম,বললো,
" শুনেছি, ভোরে রওয়ানা দিচ্ছি। দেখি কালকে কি করা যায়।"
৪.
পরদিন বাদ এশা আমি, আরেফিন সাহেব,আখতার সাহেব ও হোসেন সাহেব সহ আমরা ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় গেলাম, আড্ডা প্লাস ঘটনাটা শোনার জন্য। ব্যারিস্টার সাহেব বললেন,
সিদ্দিক সাহেব ঘরে ঢোকার সময় একটা জরুরী ফোন আশায়, রাস্তায় এটা সেরে ঘরে ঢুকবে এটা ভেবেছিল।
আউয়াল জানালা দিয়ে তাকে অশ্লীলভাবে, ডিস্টার্ব করার জন্য কটু বাক্য বলে।
সিদ্দিক সাহেবও জবাব দেন। তখন আউয়াল
এবং আউয়ালের বউ ঘর থেকে বের হয়ে তার উপরে ঝাপিয়ে পড়ে।
সে কোন রকমে প্রাণ নিয়ে তার ঘরে ঢুকে যায়।"
তখন একজন বলে ওঠে,
" আমাকে তো এই ঘটনাটা মোবাইলে রেকর্ড করে একজন পাঠিয়েছে। "
আমরা সবাই রেকর্ডটা দেখলাম। সিদ্দিক সাহেব কি বলেছে,
আর আউয়াল কি বলেছে সেটা বোঝা গেল না। তবে তাদের ধস্তাধস্তি এবং আউয়ালের তার পিঠে কিল ঘুসি মারার সিনটা খুব সুন্দর ভাবেই রেকর্ড হয়েছে,
সাথে তার স্ত্রী ও ছিল। সিদ্দিক সাহেবের বাসার দারোয়ান সিদ্দিক সাহেবকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং কোনরকমে তার বাড়ির গ্যারেজে ঢুকিয়ে ফেলল, এটা স্পষ্ট দেখা গেল। সিদ্দিক সাহেব ভিডিও ধারণের পূর্বে, যদি কোনো যে কোন প্রকার আঘাত করে থাকে সে অন্য কথা , তবে
সে কোনো আঘাত করেনি তাও এই ভিডিওতে স্পষ্ট। সিদ্দিক সাহেব ব্যারিস্টার সাহেবের জুনিয়র। আমরা ব্যারিস্টার সাহেবকে বললাম,
"ভাই আউয়াল অনেক অন্যায় কাজ করে ফেলেছে। সিদ্দিক
সাহেবকে অনুরোধ করে এটা আপনি মিটিয়ে ফেলতে পারেন। "
উনি বলল,
" কিছুতো একটা করতে হবে। "
উনি সিদ্দিক সাহেবকে ফোন দিলে সিদ্দিক সাহেব আসলো। আমরা উনার কাছে ঘটনা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে পুরো ঘটনা আবার জানতে চাইলাম। উনি বললেন,
" ভাই আমি বাইরে থেকে এসে আমার বাসায় ঢুকবো,
এমন সময় একটা জরুরী ফোন আসলো। আমি ভাবলাম ফোনটা এটেন্ড করেই বাসায় ঢুকি, কারণ ফোনটা নিয়ে লিফটের বাটন টিপতে অসুবিধা হবে এবং লিফটে ফোনের নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই, আমি রাস্তায় কথা শেষ করে বাসায় ঢুকতে চাইলাম। আউয়ালের বাসার সামনে দিয়ে কথা বলতে বলতে যাচ্ছি, আবার পিছন ফিরে আমার নিজের বাসার দিকে ফিরে আসছি। এভাবেই পায়চারীরত অবস্থায় আমি কথা বলছিলাম। আউয়াল জানলা খুলে আমাকে বলল,
রাত্রে কি মানুষ ঘুমাবে না?
অশ্লীল ভাষা ইউজ করে আমাকে সরে যেতে বলল।”
আমি বললাম,
“রাত্রে কি একটু রাস্তায় কথা বলা যাবে না?”
সে আমাকে গালি দিয়ে বের হয়ে এসে আঘাত করার জন্য হামলা করলো। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে বাসার দিকে রওনা দিতে চেষ্টা করলাম। সে আমার পিঠে অনেকগুলি আঘাত করলো। যেটা আমার শুধু পিঠে আঘাত হয় নাই,
আমার মনে এবং সম্মানে প্রচন্ড আঘাত করা হয়েছে। তার স্ত্রীও এতে সঙ্গ দিয়েছে। "
বললাম,
" সিদ্দিক ভাই,
যা হয়েছে তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই লজ্জা ও দুঃখজনক ঘটনা আশা করাও আমাদের জন্য লজ্জা, তবুও আপনার হাতে ধরছি,
এটা যেন বেশিদূর না গড়ায়। "
উনি কথা দিলেন,
" ঠিক আছে আপনারা সমাজ কল্যাণ সমিতির লোক,
আপনাদের কথা না রেখে কি পারা যাবে?”
‘আখতার সাহেব, আরেফিন সাহেব ও ব্যারিস্টার সাহেব সবাই অনুরোধে করলে,
সবার অনুরোধে উনি একটু নরম হয়ে আসলেন।
৫.
এই ঘটনার পর দিন রাতে আখতার সাহেব সিলেট চলে গেলেন সপরিবারে এক বিয়ের দাওয়াতে। রশিদ সাহেব কখনোই একা ব্যারিস্টার সাহেবের ওখানে আড্ডা দিতে জাননা। তাই দুইদিন ব্যারিস্টার সাহেবের ওখানে যাওয়া হলো না। এই দুই দিনই এই ঘটনাকে এক বিপর্যয়কর রূপ দেবে তা রশিদ
সাহেবরা কখনোই কল্পনাও করতে পারেননি। রবিবার রাতে, আখতার সাহেবরা সপরিবারে ঢাকায় বাসায় এসে পৌঁছলো, সিলেট থেকে। সোমবার দিন এশার নামাজ পড়ে রশিদ সাহেব ও আখতার সাহেব ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় যাওয়ার জন্য তার বাসার নিচে এসে দাঁড়ালো। রশিদ সাহেবের ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় যাওয়ার কেন যেন সেদিন ইচ্ছে জাগলো না।
আখতার সাহেব কে বলল,
" আজকে বাদ দিন আগামীকাল যাব।"
কিন্তু তখন ব্যারিস্টার সাহেবের রুমে এক প্রয়োলংকরী ঘটনার সূত্রপাত হতে যাচ্ছে তা রশিদ সাহেবদের চিন্তাতেও ছিল না। তারা আউয়ালের
ঘটনা থেকে দূরে থাকা অবস্থায়, আরো অনেক যে ঘটনা ঘটছে তা তাদের চিন্তাতেও ছিল না। সমিতির সহ-সভাপতি আলী সাহেবের নেতৃত্বে ইসলাম সাহেবের উপস্থিতিতে তারা জামান সাহেবকে জানিয়ে এই ঘটনাটা সুরাহা করতে গেল। অথচ ব্যারিস্টার সাহেবের সাথে রশিদ সাহেব আখতার সাহেব এবং বদরুল সাহেবদের যে সম্পর্ক ছিল তা উনাদের সাথে ছিল না।
আখতার
সাহেবরা
প্রায় সব সময় ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় চা খেয়ে গল্প গুজব করত। সব সময় যারা সহবতে থাকে তাদের জন্য সহমর্মিতা একটু আলাদাই থাকে। সম্পর্ক ভালো থাকলে কটু কথা মিষ্টি লাগে, সম্পর্ক ভালো না থাকলে মিষ্টি কথা অনেক সময় কটু লাগে। ঠিক সেই ঘটনা এখানে ঘটলো,
একটু সমাজপতি সুরে আলি সাহেব কথা বলায় ব্যারিস্টার সাহেব মাইন্ড করলেন।
এর আগে একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল আউয়াল মারামারি করেও কার যেন পরামর্শে,
থানায় গিয়ে একটা জিডি করে এসেছিল। এই ঘটনাটা আখতার গ্রুপের সাথে আলাপের পর দিন সিদ্দিক সাহেব জানতে পারল।
সে ভীষণ ক্রোধান্নিত হলো। কাউকে কাছে না পাওয়ায় তার বিক্ষিপ্ত রাগান্বিত মন সে শান্ত করতে পারল না। তাই পরের দিন কোর্টে গিয়ে সে একটা সি আর মামলা রুজু করলো খিলগাঁও থানার অন্তর্গত ১৩ নং চিফ
মেট্রোপলিটন মেজিস্ট্রেট কোর্টে
সি এম এম কোর্ট,যেখানে ঢাকার মেট্রোপলিটন থানার সীমানার মামলা গৃহীত হয়। তার সহকর্মী এবং বিভিন্ন উকিলরা তাদের এই সহকর্মীর মার খাওয়ার ঘটনা শুনে এবং ভিডিও ক্লিপস দেখে রাগান্বিত হলো।
মামলা রত স্থানে গিয়ে তারা জজের সামনে প্রতিবাদ করল, এতে জজ সাহেব অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট সাথে সাথে জারি করে দিলেন, যা সংশ্লিষ্ট থানায় দ্রুতগতিতে চলে গেল। যার একটা কপি সিদ্দিক সাহেবের হাতে ছিল।এ ওয়ারেন্টটা বের হতে কমপক্ষে ৭-৮ দিন লাগে,
তবে আদালতের নিজেদের লোকের ঘটনা বলে দ্রুত হলো। অবস্থাটা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকতো কারণ, সিদ্দিক
সাহেব, রশিদ সাহেবদের কথা দিয়েছিলেন, তাই যখন সোমবার রাতে যখন আখতার সাহেবরা গল্প করতে ঢুকবে কিনা ভাবছিলো, আলী সাহেবরা ব্যারিস্টার সাহেবের বাসায় এসে সমিতির বড়াই দিলো এবং সেক্রেটারি জামান সাহেব ফোনে বলল,
" ও তো জিডি করে ফেলেছে দেখি ওকে কিভাবে থামানো যায় বা নমনীয় করা যায়।"
এই কথা শুনে সিদ্দিক সাহেব তার সিনিয়র ব্যারিস্টার সাহেব কে বলল,
“স্যার মার আমি খেয়েছি,
আবার জিডির পাল্লায় আমি পড়বো? আমার কি কোন মান সম্মান নেই। "
ব্যারিস্টার সাহেব কিংকর্তব্য বিমুর হয়ে পড়ল,
কি বলবে, কি সান্তনা দেবে তা সে বুঝতে পারল না,
এদিকে রশিদ সাহেবের গ্রুপও কয়েকদিন ধরে আসে না সে বলল,
" সিদ্দিক সাহেব আপনার যা ভাল মনে হয় তাই করুন, আমি এই সমাজেরই লোক সুতরাং সমাজ মেনেই আমাকে চলতে হবে। "
এর বাইরে উনি আর কিছুই বলতে পারলেন না সিদ্দিক সাহেব চলে যাবার সময় তার সিনিয়র ব্যারিস্টার সাহেবকে বলছিলেন,
"স্যার, মার আমি খেয়েছি আবার জিডিও আমার বিরুদ্ধে হোলো? এখন কি,ব্যবস্থা আমি নিবো না?"
ব্যারিস্টার সাহেব কোনো উত্তর দিতে পারলেন না.
চুপ করে রইলেন। পরে বললেন,
"ঠিক আছে আপনার যা করণীয় তা করেন। "
৬.
বাসায় গিয়ে তার ভিতরে ভীষণ অস্থিরতা কাজ করলো একে তো মার খেয়েছে তার উপরে জিডির অপমান এভাবে চুপ করে বসে থাকলে তো চলবে না। মান ইজ্জত যদি না থাকে তো জীবনের মূল্য কি? উনি রাত্রে সাড়ে এগারোটার দিকে থানার দিকে চলে গেলেন।
থানায় যাবার পরে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তারা যারা আগেই অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পেয়েছিলেন, উনার অ্যারেস্টের কপি দেখে মুহূর্তের মধ্যেই প্রস্তুতি নিয়ে আউয়ালের বাসার দিকে রওনা দিল। কারন কোর্টের অর্ডার। আর পুলিশ কোর্ট কে ভীষণ মান্য করে এবং ভয় পায়, তারা গাড়ি নিয়ে আউয়ালের বাসার সামনে থামল।
আউয়ালের বাসায় পুলিশ এসেছে শুনে জাহিদ ভাই আশরাফ ও আরো কয়েকজন অ্যারেস্ট যাতে না হয় বাধা দিতে চেষ্টা করল। পুলিশ তাদের স্পষ্ট বলল,
" কোর্টের অর্ডার আমাদের কিছুই করার নেই,
যা কিছু করবেন কোর্ট এ গিয়ে করবেন। আইনের হাতে আমাদের হাত বাধা। "
তারা কারো কোন অনুরোধ শুনলো না তাকে এরেস্ট করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেল সাথে জাহিদ ও আশরাফ সাহেব গেল থানা পর্যন্ত। ওখানেও তারা অনেক অনুনয় বিনয় করল, কিন্তু কোন লাভ হলো না। পুলিশের একটাই কথা,
" কোর্টের অর্ডার আমাদের কিছু করার নাই।
"
তারা সেই রাত্রে এসে ব্যারিস্টার সাহেবের সাথে দেখা করলো। ব্যারিস্টার সাহেব বলল,
" যখন পুলিশের এসেছিল তখন একটা চেষ্টা করলে হতো, কিন্তু এখন তারা খাতায় এন্ট্রি করে ফেলেছে। সুতরাং কোর্টের বাইরে কিছুই করা যাবে না। "
রাতেই রশিদ সাহেব,
আখতার সাহেব, বদরুল সাহেব সহ সবার কানেই এই কথা চলে গেল। পরদিন ভোরেই তারা ব্যারিস্টার সাহেবের ওখানে হাজির হলো। উনি বললেন,
"রাতে সিদ্দিক সাহেব আসলে বসি,
দেখি কি করা যায়?"
৭.
এদিকে সকাল ১০টায় আউয়ালকে থানা হাজত থেকে প্রিসন ভ্যানে আরো কয়েক থানার আসামী সহ দুপুর ১টায় কোর্ট হাজত বা গারদে হাজির করলো। তারপর তাকে ১৩ নং কোর্টের বিচারক জেল হাজতে পাঠিয়ে দিলেন। শুরু হলো আউয়ালের হাজতবাস।
|
|
|
প্রিসন ভ্যান |
|
|
|
কোর্ট হাজত বা গারদ |
রাতে রশিদ সাহেব,
আলী সাহেব, আখতার সাহেব,
বদরুল সাহেব বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক সাহেব সহ সমিতির সবাই এসে হাজির হলো। এলাকার একজন ছেলে ঝগড়ার কারণে,
জেলখানায়, এটাতো একটা ভদ্র সমাজে চলতে পারে না?
কিভাবে এটা মিটমাট করা যায় সেই আলোচনা চলতে লাগলো। সিদ্দিক সাহেব ব্যারিস্টার সাহেবের জুনিয়র সুতরাং তার কথা ফেলতে পারবে না। তাই
|
পিছনে যাই হয়েছে এখন উনাকে দায়িত্ব দেওয়া হল, ব্যাপারটা মিটমাট করার জন্য এবং আউয়ালকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। ব্যারিস্টার সাহেব সিদ্দিক সাহেবকে ফোন দিলেন। ফোন পেয়ে সিদ্দিক সাহেব আসলেন। তিনি জানতে পারলেন আখতার সাহেব না থাকার কারণে, তাদের সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয় নাই। তাই ব্যাপারটা আরো খারাপের দিকে গড়িয়েছে। পূর্ণ ঘটনা জানতে পেরে এবং আবার সবার অনুরোধে সে নমনীয় হলো, এবং বলল,
" আমার ভিতর রক্তক্ষরণ ঘটলেও আমি সমাজের কারণে মিলের পথের বাইরে হাটলাম না।
"
উনি জানালেন, পরদিন কোর্টে গিয়ে সমঝোতার ব্যবস্থা করে আউয়ালকে বেইল করিয়ে দিবেন।
এ ব্যাপারে জাহিদ খান, রশিদ সাহেব,
বদরুল সাহেব সহ আশরাফ এবং নয়ীমকেও দায়িত্ব দেয়া হলো সবদিক দেখা সোনার জন্য। তবে পরের দিন কোর্টে যাবে জাহিদ,আশরাফ ও নায়ীম সাহেব। বদরুল সাহেব ও রশিদ সাহেব তাদের একটা কাজ থাকার কারণে যেতে পারবেন না।
৮.
আখতার গং হাফ ছেড়ে বাঁচল। সব সমস্যার এখানেই বুঝি সমাধান হয়ে গেল। আসলে এই নাটকের ইন্টারভেলেরও সময় যে হয়নি তা তারা বুঝতে পারল না।
পরদিন যথাসময়ে সংশ্লিষ্টরা কোর্টে চলে গেল। কোর্টে সিদ্দিক সাহেবের সঙ্গের উকিলরা মোটেও ছাড় দিতে রাজি না। তবে,
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সাহেবের কথায় এবং অনুরোধে তারা শান্ত হলো। এদিকে বাইরে সিদ্দিক সাহেবের শ্যালক ও স্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিল,
তারা আউয়ালের স্ত্রীকে দেখিয়ে বলছে,
" ও জড়িত,
ওকেও অ্যারেস্ট করার ব্যবস্থা করা হোক। "
কিন্তু সিদ্দিক সাহেবের হস্তক্ষেপে তারা আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারল না। যাইহোক,
শুনানির পরও আউয়ালের সেদিন জামিন হলো না পরের দিন আবার তারিখ পড়লো শুনানি হবে ।
নিম্ন আদালত বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট একটা ভিড়ভাট্টা পূর্ণ এজলাস, সকালবেলা কোর্ট
ওঠার সময় লোকে লোকারণ্য থাকে ভিতরে ঢুকাই মুশকিল হয়ে যায়। আর উকিল সাহেবরা নিজেরা আরাম আয়েশে বসার কারণে ভিতরে মক্কেলদের বসতেই দিতে চান না।
তারপরেও অনেক কষ্ট করে সিদ্দিক এবং আউয়াল সাহেবের লোকেরা ভিতরে এবং বাইরে অবস্থান নিল। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ১৩ নং কোর্টে এডভোকেট সিদ্দিক সাহেবের মীমাংসার কথা জানানোর পরে এবং ব্যারিস্টার সাহেবের মধ্যস্থতায় বিজ্ঞ বিচারক আউয়ালের
জামিন দিলে, সিদ্দিক সাহেবরা বাসার দিকে চলে আসলো আর কোর্টের কাগজপত্র নিয়ে আউয়ালের লোকেরা জেলখানার দিকে তাকে রিলিজ করার জন্য ছুটে গেল। কিন্তু সময় অভাবে পৌঁছাতে না পারার কারণে সেদিন সে রিলিজ পেল না, আরো একটি রাত তাকে জেলে কাটাতে হলো। পর দিন সকালবেলা তার জামিন হয়ে গেল।
| মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ১৩ নং কোর্ট |
জামিন হলো মীমাংসার শর্তে সুতরাং মামলা চলমান রইল।
|
৯.
আউয়ালের যেদিন জামিন হলো সেদিন সন্ধ্যাবেলা আবার সবাই একত্রিত হল।
আউয়াল এর সাথে সিদ্দিক সাহেবের কোলাকুলি করিয়ে দেওয়া হল, এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার আর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই জন্য উভয়কেই জানানো হলো। উভয়ই কোলাকুলি করল, এবং দুঃখিত হল। যাহোক, তাহলে দু'একদিনের মধ্যেই মামলা মোকদ্দমা ফিনিশ হয়ে যাবে? তা হলো না, একটা ডেট পড়েছিল, সেই ডেটে ১৩ নম্বর কোর্টে আওয়াল গ্রুপ এডভোকেট সহ এবং সিদ্দিক সাহেব তার কলিগদের সহ এবং ব্যারিস্টার সাহেব তার জুনিয়র সহ হাজির হলো। ওখানে কোর্ট ওঠার পরে ফাইল বিচারিক আদালতে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত জানানো হলো, অর্থাৎ আরো কিছুদিন ঘুরতে হবে এবং যে আদালতে মামলা ফাইল করা হয়,
সেখানে জামিন পর্যন্ত থাকে,
সেই আদালত থেকে সেই
কোর্ট থেকে ২১ নং কোর্টে এবং সেখানে ২/৩ টি ডেট পার হওয়ার পর ১৬ নম্বর কোর্টে মানে সিএমএস এর ১৩ নং কোর্টের একতালা উপরে ১৬ নম্বর কোর্ট সেখানে প্রেরণ করা হলো। সেখানে দুইটি ডেট গেল প্রথম ডেটে জিজ্ঞেস করা হলো মীমাংসা পত্র অর্থাৎ দলিল হয়েছে কিনা?
মীমাংসার প্রসঙ্গে উভয় পক্ষের উকিল জানালো,
" স্যার আগামী ডেটে দাখিল করব।
"
হাজিরা দিল,
আওয়ালের উকিল টাকা নিল,
এবং পরবর্তী ডেটের কথা ফোনে জানিয়ে দেবে বলল। সিদ্দিক সাহেবের পক্ষ এবং ব্যারিস্টার সাহেব আমাদের রশিদ গংকে পরবর্তী ডেটের কথা জানালো এবং দ্রুত একটা আপোষনামা
করার জন্য প্রস্তুতি নিল। ৩০০/- টাকার স্ট্যাম্পে আপসনামা হল। বাদী বিবাদী প্রথম পক্ষ এবং দ্বিতীয় পক্ষ হল। ঘটনা লেখা হলো। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেই শর্ত সমূহ লেখা হলো।
সেখানে সমাজের পক্ষ থেকে সভাপতি সাহেব এবং ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সাহেব স্বাক্ষর করলো।
বাদী বিবাদী স্বাক্ষর করল। সাক্ষী হিসাবে আশরাফ এবং নাঈমকে নেওয়া হলো। এভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ ডিড তৈরি হলো।
নির্ধারিত ডেটে সেই ডিডটি নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা জমা দিল। বিচারক আরেকটি তারিখ দিলো। সেদিন ব্যারিস্টার সাহেব আওয়ালকে জানালো,
" এটার একটা কপি খিলগাও থানায় জমা দিয়ে দিয়েন।
"
আউয়াল সাহেব থানায় নিয়ে গিয়ে জমা দিল আই ও এর নিকট। আই ও সাহেব কোন রিসিভিং কপি দিল না। পূর্বে থানা থেকে আই ও সহ দুইজন অফিসার সম্পূর্ণ ঘটনা এলাকা থেকে জেনে গিয়েছে। সভাপতি সাহেব তাকে মীমাংসা হয়ে গেছে বলে বিস্তারিত জানিয়েছে। অর্থাৎ খিলগাঁও থানা জানতে পেরেছে,
ঘটনাটার সমঝোতা হয়ে গিয়েছে। এরপরে সিদ্দিক সাহেব এবং আওয়াল সাহেব নির্ধারিত তারিখের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
১০.
নির্ধারিত তারিখ এলো, তারা কোর্ট হাজির হলো বিচারকের তরফ থেকে জানানো হলো, থানা থেকে রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত তারা মামলা শেষ করতে পারবে না। একটা নতুন তারিখ দিয়ে দিল অর্থাৎ ওই তারিখে আসলেও যদি রিপোর্ট না আসে তাহলে মামলা নিষ্পত্তি হবে না। আওয়াল সাহেব থানায় গেল তাদেরকে জানালো। তারা বলল,
" পাঠিয়ে দিচ্ছি।
"
|
|
|
জি আর শাখা, যেখান থেকে আদালতের পত্রাদি প্রেরিত হয় |
আর কিছু করার নেই পরবর্তী তারিখের জন্য অপেক্ষা শুরু হলো, পরবর্তী তারিখেও হাজিরা দিয়ে, উকিলকে টাকা দিয়ে, দেখা গেল রিপোর্ট আসেনি। নিম্ন আদালতে ভোরবেলা যেতে হয়। আটটার সময় রওনা দিলে নয়টা সাড়ে নটার মধ্যে উকিলের চেম্বারে পৌঁছানো যায়। সেখানে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই হাজিরা পাতায় সই করে হাজিরা জমা দেয়। তারপরে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ায়। মামলার সময় আসলে তখন জানানো হয় রিপোর্ট আসে নাই। পরবর্তী তারিখ দেয়া হয়। সেই তারিখ আবার পরের দিন উকিলকে ফোন দিয়ে জানা যায়। এভাবেই কয়েক মাস চলে গেল।
থানায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলেই বলা হয়,
" পাঠাচ্ছি। "
১১.
এই ফাঁকে ঈদ আসলো। ঈদের পরে থানা থেকে পুলিশ আসলো। খোঁজখবর নিতে পয়সা চাইল। আউয়াল সাহেব পয়সা দিলেন না, কারণ, সমঝোতা যেহেতু হয়ে গিয়েছে, ব্যারিস্টার সাহেব তাকে কোনরকম পয়সা দিতে মানা করেছিল। উনি বলেছিলেন,
"প্রয়োজনে আমি কোর্ট কে তাগিদ দিবো,যাতে কোর্ট
থানা থেকে রিপোর্ট আনার জন্য চিঠি পাঠায়।
"
এইভাবে দেড় বছর পরে গত ৫/৪/২০২৬ ইং তারিখ রবিবার ধার্য তারিখে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। থানা থেকে রিপোর্ট পাঠিয়েছে তাতে সমঝোতার ডিড পাওয়ার কোন কথা লেখা নাই। এবং এপিপি সাহেব মামলা মিটমাটের ব্যাপারে কথা না বললেও,
ব্যারিস্টার সাহেবের অনুরোধে এবং বাদী অ্যাডভোকেট সিদ্দিক সাহেবের অনুরোধে মামলা রওনক জাহান তাকির সি এম এম ১৬ নং কোর্ট নিষ্পত্তি করে দিল।
রওনক জাহান তাকির সি এম এম ১৬ নং কোর্ট
এভাবেই সামান্য একটা ঘটনার দীর্ঘ সময়ে সমাধান হলো।
ব্যারিস্টার সাহেব “এগারোটা চুয়াল্লিশ” মিনিটের সময় ফোন দিলো,
বললো,
" মামলা শেষ হয়েছে। কমিটি থেকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে। "
আউয়াল সাহেবের সাথে দেখা হল,
বললাম,
" ব্যারিস্টার সাহেব তো মিষ্টি খেতে চেয়েছে। "
বলল,
" ঠিক আছে আমি ভালো মিষ্টি নিয়ে আসবো। "
রশিদ সাহেব ঘটনাটা সমিতির সবাইকে জানালো। সবাই বলল,
" আউয়াল তো মিষ্টি আনবে তাহলে আমরা কি নিতে পারি?"
রশিদ সাহেব বলল,
" আমরা ঝাল নেব অর্থাৎ দশ টাকা দামের ২০-৩০ টা আলুপুরী নিয়ে যাব। "
সবাই একসাথে হলাম আলুপুরি, মিষ্টি খেয়ে আনন্দ প্রকাশ করলাম। এবং নিত্যকার মতো ব্যারিস্টার সাহেব সবাইকে চা খাওয়ালো।
ঘটনাটা শুনতে খুবই মধুর লাগে কিন্তু এর বাস্তবতা যে কত নির্মম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না,
অত্যন্ত সামান্য ঘটনা কিন্তু দেড় বছর চলে গেল তার চূড়ান্ত সমাধান পেতে উভয়েরই মনে অনুশোচনা অনুতাপ সৃষ্টি হলো, এবং ভবিষ্যতে না করার সিদ্ধান্ত সৃষ্টি হল। এই সিদ্ধান্ত এই সমাজে সব সময় বলবৎ থাকে এবং সবার মাঝে যেন ক্ষমা সুলভ দৃষ্টি থাকে, সেই আশা করে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।