যার মনে যা লাগে ভালো :
![]() |
| Read it: |
অতীতাস্মরণ -৩ বা flashback -/3
যার মনে যা লাগে ভালো :
এশিয়া কাপ ক্রিকেট ২০২৫ শেষ হলো। নাটকিয়তায় পরিপূর্ণ টুর্নামেন্ট নিজের দেশ বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দলের খেলা দেখে মাথার চুল আমি সহ অনেকেই টেনে ছিড়েছে আমি খুব কষ্টে খেলা দেখেছি কারণ ছেলে সি.এস. ই পড়ে হঠাৎ তার কম্পিউটারের মনিটর নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নিচের অর্ধেক দাগ হয়ে থাকে দেখা যায় না প্যানেল সমস্যা উপরের অর্ধেকে হলেও কাজ চালানো যেত বন্ধ খোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বার নিচের দিকে তাই মনিটরের প্রয়োজন। আমাদের স্মার্ট টিভি টাকেই মনিটর বানিয়েছে অতএব আমাদের টিভির প্রোগ্রাম বা ইউটিউব দেখা বন্ধ সে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে দিনে ভার্সিটিতে থাকে। তখন আমরা সবাইও নানা কাজে ব্যস্ত থাকি, আমরা তখন কিছু দেখতে পারি না । সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখ থেকে অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত স্কুল কলেজের লম্বা ছুটি তাই কলেজ পড়ুয়া ছোট ছেলের টিভি দেখতে মন চায়, স্ত্রীরও মন চায়, সাথে আমারও। রাতে এশার পরে সবাই একসাথে বসেছি, ও বলল,
" এখন তোমরা দেখতে পারো। "
আমি বললাম,
" তা কতক্ষণের ব্রেক। "
ও বলল,
" যতক্ষণ ইচ্ছা। "
আমি বললাম,
" আমি আদালত বাংলা দেখব ইন্টারনেটে ,
ছোট ছেলে বলল ,
"না আমি ব্যাটম্যান কমিক দেখব। "
স্ত্রী কিছু বলল না, আমি বললাম,
" তোর মায়ের জন্য শাকিব খানের তান্ডব ছবিটা ছেড়ে দে।"
বড় ছেলে বলল,
" ওটা একটা ছবি হল নাকি? আমি একটা ছবি ছেড়ে দেই দেখো এবং দেখার পর কমেন্ট কোরো। "
আমাদের মতামত পাওয়ার পূর্বেই সে একটা হিন্দি মুভি স্টার্ট করে দিল ছবির নাম "লাকি ভাস্কর" দেলকার সালমান নায়ক। হাস্বত মেহেতার ব্যাংক স্কেম নিয়ে ছবির কাহিনী।ক্লাইম্যাক্স থ্রিল এ পরিপূর্ণ সু অভিনীত মুভি। একটি জানা ঘটনা হলেও কিভাবে সুন্দর ভাবে আকর্ষণীয় করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা যায় এটা হল সেই ছবি। কোন এড নাই আমার বড় ছেলে এবং আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখলাম। দুলকার সালমান বা ভাস্করের চাকরি, বাধা ডিঙিয়ে চাকরিতে প্রমোশন না হওয়া বাইরে পার্ট টাইম কাজ করা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক বেআইনি কাজ তদুপরিও প্রমোশন, হাস্বত মেহেরা গংগের সাথে মিশে যাওয়া এবং ক্লাইম্যাক্স এর মাধ্যমে সে জাল ছিন্ন করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া যা এক কথায় একজন দর্শককে সিনেমার মধ্যে ধরে রেখে বিনোদিত করার একটা সফল প্রচেষ্টা।
ছবি শেষ হওয়ার পর তৃপ্ত হলাম। ছবি শেষ করার পর তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সময় খেয়াল করলাম,
আরে আমার স্ত্রী তো পনেরো মিনিটের মধ্যেই চলে গিয়েছে!
আর তখনই ঘটলো আমার অতীতাস্মরণ বা ফ্ল্যাশব্যাক:
| READ MORE |
পূর্বে বিনোদনের জন্য একটি মাধ্যমই ছিল বিটিভি। সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপন, ছায়া ছন্দ, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান এগুলোর মাধ্যমে মানুষ বিনোদিত হতো এর বাইরে কেউ আরো বেশি বিনোদিত হতে চাইলে দেখতো সিনেমা, কারণ মঞ্চ নাটকের প্রতি আসক্তি আমাদের মতো অধিকাংশ পরিবারেরই ছিল না।
সিনেমার খবর পেতাম দৈনিক পত্রিকা আর না হয় টিভিতে বিজ্ঞাপন।
সেই সময় টিভিতে একটা সিনেমার জোর যার বিজ্ঞাপন চলছে নাম "নান্টু ঘটক" একটু পরপরই গানের অংশ দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দেখায়,
"চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া,
ঢাকা শহর দেখবো আজ দুইজনে ঘুইরা ঘুইরা,
ও পাবলিক ভাই সাইকেলের ব্রেক নাই.
মইরো না নিচে পইরা।.....
এছাড়াও,
" পাঙ্গাস মাছের পেটি আর রুই মাছের কোল,
ইলিশ মাছের দোপেয়াজা ইলিশ মাছের ঝোল,
ভাইজান খাইয়া যান, খাইয়া যান,
ঘরের লাইগা লইয়া যান না......
এই বিজ্ঞাপন দেখে আমার বর্তমানে প্রয়াত আম্মা ছবিটি দেখার খুব আগ্রহ প্রকাশ করল। সাধারণত উনি কোন ছবি দেখতে চান না এবং রাস্তাঘাটো সে চিনেন না। সহজ সরল গৃহিণী। উনার আগ্রহ দেখে আমার উপর দায়িত্ব পরল এই ছবি উনাকে দেখানোর। আমি সিনেমা পাগল এই প্রস্তাবে মহা খুশি, ফ্রিতে সিনেমা দেখা, খাওয়া-দাওয়া, আসা ইত্যাদি সবই পাব ফ্রীতে। বিস্তারিত বলার পূর্বে আমার আম্মা সম্পর্কে একটু বলে নেই,
একদিন তাকে নিয়ে বের হয়েছি আত্মীয়র বাসায় বেড়ানোর জন্য ফেরার পথে তিন বাড়ি পূর্বে হাতের বাম দিকের রোডে ঢুকলেই তিনবাড়ি পর আমাদের বাসা। আমি রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে বললাম,
"আম্মা তুমি বাসার গেটে গিয়ে নামো, আমি একটু কাজ সেরে আসছি। "
আর রিক্সাওয়ালাকে বললাম,
"বামে যেও। "
আমার সহপাঠীর গেটে নক করতে যাব হঠাৎ মনে হল আম্মা কি বাড়িতে পৌঁছেছে? না ভুলে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে আমি নক করা বাদ দিয়ে দৌড়ে গলির মাথায় গেলাম, তাকিয়ে দেখি কোন রিক্সা নেই। বের হলে তো দেখতাম, নাকি সোজা আদর্শ স্কুলের দিকে চলে গেছে?
আমি অলিম্পিকের গোল্ড মেডেলিস্টের রেকর্ড ব্রেক করে দৌড় লাগালাম। ঠিকই যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। আদর্শ স্কুলের সামনে একজন মহিলা রিক্সাওয়ালা তর্ক করছে মানুষজন ভিড় করে তাকিয়ে দেখছে যতদূর থেকেই দেখি নিজের মাকে চিনতে অসুবিধা হলো না আমার। আম্মা রিক্সাওয়ালাকে বলছে, "এতদূর তো না, এত দূরে কেন নিয়ে আসলে?"
রিকশাওয়ালা বলছে,
আফনের বাড়ি আফনি চিনেন না তো আমি কি করুম?"
আমি রিক্সার কাছে যেয়ে বললাম,
" পিছে যাও ।"
এই অবস্থা সম্পন্ন এক মহীয়সী নারীকে নিয়ে যাব সিনেমায়, মহীয়সী এজন্য, ঘর-সংসার সন্তান স্বামী ও মেহমান দেখাশোনা এবং একজন কর্তব্য নিষ্ঠ মায়ের কার্যসম্পাদন ছাড়া দুনিয়াতে আর কিছুই উনি করেন নাই। পর পুরুষ উনাকে দেখেন নাই।
| READ MORE |
যথারীতি আমরা তিনটা ছয়টার শো দেখার জন্য চলে গেলাম, সিনেমা হলের নাম "স্টার"। যে চৌরাস্তাটা একটা গিয়েছে সদরঘাটের দিকে একটা ইসলামপুরের দিকে একটা জগন্নাথ কলেজের দিকে আরেকটা বাংলাবাজারের দিকে সেটার মোড় থেকে ইসলামপুর যাওয়ার রাস্তায় পাটুয়াটুলি এই পাটুয়াটুলিরই এক বামদিকের গলিতেই দুইটি পাশাপাশি সিনেমা হল ডান পাশে স্টার সিনেমা হল রাস্তা সংলগ্ন এবং রাস্তার অপজিটে মুন সিনেমা হল। বা পাশে রিকশা থেকে নেমেই রাস্তা সংলগ্ন গেট দিয়ে ঢুকলেই স্টার সিনেমা হলে টিকিট কাউন্টার, আর রাস্তার অপজিটে খোলামেলা চত্বর সহ মুন সিনেমা হল যেটা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের স্টার হলে আমাদের সিনেমা নান্টু ঘটক আর মুন হলে চলছে দোস্ত দুশমন। দোস্ত দুশমন পুরনো ছবি আর নান্টু ঘটক সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি এজন্য ডিসির মানে উপরের শ্রেণীর টিকেট সব শেষ আর নিচের শ্রেণীর অর্থাৎ রিয়ের ষ্টল,স্টলএর টিকেট আছে। মাকে নিয়ে ছবি দেখব, যিনি ছবি দেখেন না বছরে একটা, তাকে নিয়ে রিয়ার স্টলে ছবি দেখব? এটাতে মন সায় দিল না আর দোস্ত দুশমন নামকরা হিট ছবি ভারতের সোলের নকল অনেকে বলে শোলে এর সামনে কিছুই না। যেহেতু, তখন আমি দেখিনি তাই আমিও তাতে বিশ্বাস করতাম কিন্তু সেটা যে অন্ধ বিশ্বাস সেটা ভিসিআর এ শোলে দেখার পরে বুঝতে পেরেছি। কারন সার্বিক মানে এটা সোলের ধারে কাছেও নেই কিন্তু তখন এটা আমার দৃষ্টিতে সর্বকালের সর্ব সেরা ছবি। আর এ ছবিটা আমার আম্মাকে দেখাতে পারবো না! দেখানোটা একটা গৌরবের কারণ হবে আমার জন্য। মাকে বললাম,
" আম্মা এই ছবির টিকেট নেই চলো মুনে যেয়ে দোস্ত দুশমন ছবিটা দেখি।"
আম্মা বলল,
" থাক তাহলে বাড়ি চলে যাই। "
আমি বললাম,
" এসেছি যখন দেখেই যাই। "
দুইটা ডিসি টিকেট কেটে হলে যেয়ে বসলাম। ছবির আর কি বর্ণনা দেব, যারা ছবি দেখে তারা সবাই এ ছবি সম্পর্কে জানে শেষ হওয়ার পর বাসায় আসলাম। আম্মা বড়ই বেজার। সবাই বললো,
" টিকেট পাশ নাই চলে আসলেই তো পারতি, আম্মাকে এ ছবি দেখাতেই হবে। " আবার বৃহস্পতিবার অর্থাৎ সিনেমার শেষদিনের দুপুরে শোতে আম্মাকে নিয়ে স্টার হলে হাজির হলাম।
হলে যেয়ে জানতে পারলাম বই ভালোই জমেছে, অর্থাৎ পরের সপ্তাহেও চলবে। ছবি শুরু হলো বাচ্চা ছেলেএকটা ঘটকালী করতে চায় বাবার রুহে বকশিশ দেবে বলে। তেমন কোন আহামরি ঘটনা না, তারপরেও ঘটনাচক্রে আলমগীর সুচরিতা ওয়াসিম ও অঞ্জনার অভিনয়ে আমার আম্মা সহ দর্শকরা বেশ আমোদিত হলো। ছবি শেষ হওয়ার পরে ঘরে ফেরার সময় আম্মার আনন্দিত চেহারা আমার মনে আনন্দ আনলো। দোস্ত দুশমন দেখেও এই ছবি আম্মার পছন্দ হলো।
![]() |
| Read others: |
আম্মা এখন দুনিয়াতে নেই। আমার বয়স ৬০ পার হয়েছে, এখন বুঝি আল্লাহ সবাইকে এক মন দিয়ে সৃষ্টি করেন নাই। করলে সবাই নবী রসূলদের মান্য করত আর পছন্দ ভালবাসা মানুষের নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে আসে তা চাপিয়ে দেয়ার কোন অবকাশ নেই চাপাতে গেলে হিতে বিপরিতি হবে আমার এক আত্মীয় আরেক আত্মীয় কে বিয়ে করেছিল ছেলে সুদর্শন, ধন সম্পদ, লেখাপড়া সবই তার আছে। ভালো চাকরি করে। মেয়ের তার সমান না হলেও কমবেশি ধন সম্পদ সবই আছে। তবে সুন্দর দেখতে না। দেখতে সুন্দর নয় বলে ছেলের পরিবার মানলো না। তারা না মানার কারণে আলাদা হলো, মেয়ের সন্তান হলো না, ছেলে মেনে নিল। অর্থাৎ পছন্দ-অপছন্দ ভালো মন্দ ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরে জোর চলে না, মনে রাখতে হবে,
"যার নয়নে যারে লাগে ভালো,
যার দিলে যার দিল হারালো। "
এই দিল হারানো এবং ভালোলাগা কারো কথায় হয় না এটা আল্লাহ প্রদত্ত। এটা মানুষের মনে আল্লাই সৃষ্টি করে দেয়, চাপিয়ে দিয়ে এখানে কিছুই হয় না আরো হিতে বিপরীত হয়।
.png)
.png)