সমিতি, সঞ্চয় ও পুরোনো জীবনের স্মৃতি | একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা

 

 সমিতি, সঞ্চয় ও পুরোনো জীবনের স্মৃতি

অতীতের একটি ঘটনা, বর্তমানের একটি শিক্ষা

বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তোলা একটি ছোট সঞ্চয় সমিতির স্মৃতি, পুরোনো দিনের বন্ধুত্ব, সিনেমা দেখা এবং সমিতি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা থেকে পাওয়া জীবনের শিক্ষা।

             

 


মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো অনেক বছর পর হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায়।

কোনো একটি দৃশ্য, কোনো মানুষের কথা, কোনো জায়গার নাম কিংবা সামান্য একটি ঘটনা পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। তখন মনে হয়—অনেক বছর আগে এমনই তো একটি ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে!

আমার বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। সময়ের সঙ্গে শরীর বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও অনেক বদলেছে। কিন্তু পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো এখনো মাঝে মাঝে ফিরে আসে।

আজ তেমনই একটি ঘটনা মনে পড়ছে—সঞ্চয়ের একটি ছোট্ট সমিতি, কয়েকজন বন্ধুর বন্ধুত্ব এবং সেই সমিতির শেষ পরিণতি।


বর্তমানের একটি ছোট ঘটনা

বর্তমানে আমার আয়ের প্রধান উৎস বাড়িভাড়া। মাসের ১০ তারিখে ভাড়া পাওয়ার পর অনেক সময় ২৫ তারিখের মধ্যেই হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে যায়।

তারপর পরবর্তী ১০ তারিখ পর্যন্ত চলতে হয় খুব হিসাব করে। ডিম, রুটি, আলু, ভাত, ডাল—এসবই তখন ভরসা।

তবে গলির মাথায় কামরানের একটি দোকান আছে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকে কিছু জিনিস বাকিতে নেওয়া যায়। তার খাতায় হিসাব লেখা থাকে, পরে টাকা পরিশোধ করা হয়।

একদিন মাগরিবের নামাজের পর কামরানের দোকানে গেলাম।

আমাকে দেখলে সাধারণত তার মুখ হাসিতে ভরে যায়। কিন্তু সেদিন তার মুখটা বেশ ভার।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কিরে কামরান, মুখটা গোমড়া কেন?”

সে বলল,

“আর কইয়েন না ভাই, আমার দোকানের সামনে প্রচণ্ড গোলমাল হয়েছে।”

আমি জানতে চাইলাম,

“কেন?”

তখন সে আমাকে একটি সমিতির গল্প বলল।


কামরানের সমিতির গল্প

কামরানরা কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে একটি সমিতি করেছিলেন।

সমিতির নিয়ম ছিল—প্রতিদিন সদস্যরা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেবেন। নির্দিষ্ট সময় পর সেই টাকা একজন সদস্য পাবেন। এরপর পরবর্তী সময়ে অন্য সদস্যরা সেই টাকা পাবেন।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো সমিতির টাকা যার কাছে জমা থাকত, সেই ব্যক্তি টাকা যথাসময়ে ফেরত দিচ্ছিল না। সে আগের মাসের টাকা একজনকে ধার দিয়েছিল, কিন্তু সেই টাকা আর ফেরত আসেনি। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই বিপদে পড়ে যায়।

কামরানের জন্য বিষয়টি ছিল আরও কষ্টের।

সে বলল,

“এ মাসের এক লাখ বিশ হাজার টাকা আমি পেতাম। ভেবেছিলাম দোকানটা একটু ভালো করে সাজাবো। এখন তো সমিতিই শেষ।”

কথাটি শুনে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল।

বাড়ি ফেরার পথে সেই সমিতির কথা ভাবতে ভাবতে আমার নিজের বহু বছরের পুরোনো একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল।


বহু বছর আগের সেই সমিতি

আমাদের সময়ের বন্ধুত্ব ছিল অন্যরকম।

আমরা কয়েকজন বন্ধু নিয়মিত আড্ডা দিতাম। কেউ ছাত্র, কেউ বেকার, আবার কেউ ব্যবসা করত।

আমাদের আড্ডার বিষয়ও ছিল বিচিত্র—সমাজ, দেশ, রাজনীতি, সিনেমা, খেলাধুলা এবং জীবনের নানা বিষয়।

আমাদের মধ্যে ছোট খোকা ছিল একজন ব্যবসায়ী। সে সূর্যোদয় স্টেশনারির মালিকের ছেলে এবং ছোটবেলা থেকেই পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই আড্ডার সময় তার কাছে সাধারণত নাস্তা-পানির ব্যবস্থা থাকত। আমাদের নিয়মিত আড্ডাসঙ্গীর সংখ্যা ছিল প্রায় দশজন।

একদিন আমাদের আড্ডার সঙ্গী ওমর বলল,

“দোস্ত, আমরা দশজন মিলে টাকা জমানোর একটা সমিতি দিই না কেন?”

প্রস্তাবটি সবার কাছে ভালো লাগল।


প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে সঞ্চয়

ওমর হিসাব করে বোঝাল—আমরা যদি প্রত্যেকে প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে জমাই, তাহলে দশজনের কাছ থেকে প্রতিদিন হবে ৫০ টাকা।

মাস শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমবে। সেই টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা যায় এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ভোটে সিদ্ধান্ত হলো—আমরা সমিতি করব।

প্রত্যেক সদস্যকে প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে জমা দিতে হবে।

তখনকার দিনে পাঁচ টাকা খুব বড় অঙ্ক ছিল না। কিন্তু নিয়মিত সঞ্চয় করার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আমি নিজেও নিয়মিত টাকা জমাতে শুরু করলাম।


সঞ্চয়ের সঙ্গে চলতে লাগল বন্ধুত্ব

সমিতির কারণে একটা ভালো পরিবর্তনও হয়েছিল।

আমরা নিজেদের খরচের ব্যাপারে একটু সচেতন হয়ে গেলাম।

বিশেষ করে ধূমপানের খরচ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ প্রতিদিনের পাঁচ টাকা আগে সমিতির ফান্ডে দিতে হবে।

এভাবে প্রায় ১৫ দিন চলে গেল।

কিন্তু মানুষ তো মানুষই।

সঞ্চয়ের পাশাপাশি পুরোনো অভ্যাস, আড্ডা এবং আনন্দও চলতে থাকে।


পুরোনো সিনেমা দেখার পরিকল্পনা

এক শুক্রবার দৈনিক পত্রিকার পাতায় চোখ পড়তেই দেখলাম পুরোনো একটি সিনেমা “বেহুলা” বিউটি সিনেমা হলে চলছে।

পুরোনো সিনেমার প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল।

সন্ধ্যার পর আড্ডায় গিয়ে বন্ধুদের বললাম,

“জানিস, বেহুলা চলছে বিউটি সিনেমা হলে।”

কথাটা শুনে বন্ধুরাও আগ্রহী হয়ে উঠল।

কিন্তু আমার তখন একটি সমস্যা।

সমিতিতে প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে দেওয়ার পর হাতে তেমন টাকা থাকত না।

ছোট খোকা বলল, টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। সে ব্যবস্থা করবে।

শেষ পর্যন্ত ওমরও আমাদের সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।


সিনেমা দেখা হলো, কিন্তু...

পরদিন আমরা তিনজন বের হলাম।

ছোট খোকার পরিকল্পনা ছিল বাসে করে যাওয়ার। কিন্তু ওমর বলল, বেবি ট্যাক্সিতে যাওয়া যাক।

শেষ পর্যন্ত আমরা বেবি ট্যাক্সিতে করে বিউটি সিনেমা হলে পৌঁছালাম।

ওমর শুধু যাতায়াতের খরচই দিল না, সিনেমার টিকিটও কিনে ফেলল।

তার আচরণ দেখে আমরা দুজনই অবাক হয়েছিলাম।

সিনেমা দেখতে দেখতে আমরা পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ডুবে গেলাম।

কিন্তু আনন্দের সেই রাতের পরেই শুরু হলো আমাদের সমিতির আসল পরীক্ষা।


সঞ্চয়ের টাকা কোথায়?

পরবর্তী শুক্রবার সবাইকে আগের বকেয়া টাকা নিয়ে আসতে বলা হলো।

এশার পর আমরা সবাই একত্র হলাম।

ছোট খোকা বলল,

“সঞ্চয়ের টাকা কোথায়? গুনে আজ সবাই বকেয়া শোধ করব।”

তখন ওমর বলল,

“টাকা তো খরচ হয়ে গিয়েছে। আগামী শুক্রবারে নিয়ে আসব।”

ছোট খোকা বলল,

“ঠিক আছে, আমরাও বকেয়াগুলো আগামী সপ্তাহে নিয়ে আসব।”

কথাটি তখন খুব বড় কোনো সমস্যা মনে হয়নি।

ভাবলাম, আগামী সপ্তাহে সবাই টাকা দিয়ে দেবে।

কিন্তু সেই “আগামী শুক্রবার” আর এল না।


সমিতির শেষ

এক সপ্তাহ গেল।

তারপর আরেক সপ্তাহ।

এভাবে দুই মাস কেটে গেল।

শেষ পর্যন্ত সবাই বুঝতে পারল—আমাদের সঞ্চয় সমিতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

যে সুন্দর উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা টাকা জমাতে শুরু করেছিলাম, সেটি ব্যর্থ হয়ে গেল।

তখন বুঝলাম—

টাকা আয় করা কঠিন, কিন্তু টাকা সঞ্চয় করা তার চেয়েও কঠিন।

আর কয়েকজন মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি আর্থিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে শুধু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই হয় না; প্রয়োজন দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা।


সেই পুরোনো স্মৃতি থেকে আজকের শিক্ষা

আজ এত বছর পর কামরানের সমিতির ঘটনা শুনে আমার নিজের সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।

সময় বদলেছে।

মানুষ বদলেছে।

টাকার পরিমাণ বদলেছে।

কিন্তু মানুষের কিছু অভ্যাস যেন বদলায়নি।

সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য খুব ভালো।

একসঙ্গে কয়েকজন মানুষ যদি নিয়মিত অল্প অল্প করে টাকা জমাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই টাকা অনেক বড় কাজে লাগতে পারে।

কিন্তু সেই ব্যবস্থায় যদি বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়, তাহলে ভালো উদ্যোগও একসময় ভেঙে পড়ে।

আমাদের সেই পুরোনো সমিতির অভিজ্ঞতা আমাকে এই কথাটিই শিখিয়েছে।


সঞ্চয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সঞ্চয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অল্প অল্প করে নিয়মিত জমালেও ভবিষ্যতে তার মূল্য অনেক হতে পারে।

প্রতিদিন পাঁচ টাকা তখন হয়তো খুব সামান্য মনে হয়েছিল।

কিন্তু নিয়মিতভাবে সেই টাকা জমাতে পারলে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে তা একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পরিণত হতে পারত।

তাই সঞ্চয় শুধু টাকা জমা করার বিষয় নয়।

এটি একটি অভ্যাস।

আর সেই অভ্যাস তৈরি করতে প্রয়োজন নিয়মিততা এবং আত্মসংযম।


শেষ কথা

কামরানের দোকান থেকে শুরু হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা আমাকে বহু বছর আগের সেই বন্ধুদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

মনে পড়ে গেল ওমর, ছোট খোকা এবং আমাদের সেই আড্ডার দিনগুলো।

মনে পড়ে গেল পাঁচ টাকা করে জমিয়ে গড়ে তোলা আমাদের ছোট্ট সঞ্চয় সমিতির কথা।

সমিতিটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সেই ঘটনার স্মৃতি আজও রয়ে গেছে।

জীবনের অনেক ঘটনা হয়তো আমাদের অর্থনৈতিকভাবে সফল করে না, কিন্তু সেগুলো আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায়।

আমাদের সেই ব্যর্থ সমিতিও তেমন একটি শিক্ষা।

টাকা খরচ করা সহজ, কিন্তু টাকা সঞ্চয় করা কঠিন। আর সঞ্চয়ের চেয়েও কঠিন হলো—মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা।



Focus Keyword:
সঞ্চয় ও জীবনের স্মৃতি








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন