কালো মূর্তির রহস্য: এক নিখোঁজ সন্ধান ও অদৃশ্য আতঙ্ক
ক্যাটাগরি: রহস্য গল্প
ঢাকার অদূরে একটি পুরোনো গ্রাম। দিনের বেলায় জায়গাটি আর দশটি গ্রামের মতোই স্বাভাবিক—সবুজ মাঠ, সরু মেঠোপথ, নদীর বাতাস আর মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু রাত নামলেই যেন গ্রামের চেহারা বদলে যায়। কুকুরের ডাক থেমে যায়, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, আর পশ্চিম প্রান্তের পরিত্যক্ত বাড়িটিকে ঘিরে নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা।
সেই বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো পাথরের মূর্তি।
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে, মূর্তিটির চোখের দিকে তাকালে বিপদ ঘটে। কেউ কেউ দাবি করে, কয়েক বছর আগে একজন যুবক মূর্তিটির কাছে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু এসব কথাকে নিছক কুসংস্কার বলেই মনে করত রাকিব।
রাকিব একজন তরুণ ব্লগার ও ইউটিউবার। রহস্যময় ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে তার বিশেষ আগ্রহ। গ্রামের এই গল্পটি শোনার পর তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
“কালো মূর্তি দেখলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়?” রাকিব হেসে বলল। “এসব তো গ্রামের গল্প!”
তার স্থানীয় বন্ধু ইমন কিন্তু হাসল না।
“তুই যেটাকে গল্প ভাবছিস, সেটা আমার পরিবারের কাছে গল্প নয়,” ইমন নিচু গলায় বলল। “আমার খালাতো ভাই এক রাতে ওই মূর্তির কাছে গিয়েছিল। তারপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর সিদ্ধান্ত নিল—সেদিন রাতেই সে মূর্তিটির কাছে যাবে।
রহস্যের শুরু
রাত প্রায় এগারোটা।
চারপাশে ঘন অন্ধকার। রাকিবের হাতে ক্যামেরা, আর ইমনের হাতে একটি টর্চ। দুজন ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়িটির কাছে পৌঁছাতেই রাকিব লক্ষ্য করল, বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
“কী অদ্ভুত!” সে ফিসফিস করে বলল।
ইমন উত্তর দিল না।
মূর্তিটির সামনে গিয়ে তারা থামল। কালো পাথরের মূর্তিটি চাঁদের ক্ষীণ আলোয় আরও অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।
হঠাৎ ইমন রাকিবের হাত চেপে ধরল।
“ওদিকে দেখ!”
মূর্তির পাশের মাটিতে ছোট একটি গর্তের মতো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সম্প্রতি কেউ সেখানে মাটি খুঁড়েছে।
রাকিব ক্যামেরা এগিয়ে ধরল।
ঠিক তখনই—
“ফিরে যাও...”
খুব ক্ষীণ একটি শব্দ যেন তাদের কানে এল।
দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
“তুই শুনেছিস?” ইমন কাঁপা গলায় বলল।
রাকিব উত্তর দেওয়ার আগেই ক্যামেরার স্ক্রিন হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল।
“ক্যামেরাটা বন্ধ হয়ে গেল কেন?”
কোনো উত্তর নেই।
দুজন আর সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত বাড়িটির উঠোন থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে ফিরে এল।
পরদিন সকালের রহস্য
পরদিন সকালে রাকিব ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করতে বসল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, রাতের কোনো ভিডিওই ঠিকমতো রেকর্ড হয়নি।
স্ক্রিনে শুধু কালো ছবি।
তবে অডিওতে একটি শব্দ স্পষ্ট ছিল—
একটানা ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
রাকিব ভলিউম বাড়িয়ে শুনতে লাগল।
হঠাৎ ভিডিওর শেষ কয়েক সেকেন্ডে একটি অস্পষ্ট অবয়ব দেখা গেল।
একজন নারী।
মূর্তিটির ঠিক পেছনে।
রাকিব শিউরে উঠল।
সে ইমনকে ডাকল।
দুজন মিলে ভিডিওটি আবার দেখল। এবারও একই দৃশ্য।
কিন্তু সেখানে কোনো নারী থাকার কথা নয়।
তারা বিষয়টি পুলিশকে জানাল। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চারপাশ পরীক্ষা করল। কিন্তু আগের রাতের খোঁড়াখুঁড়ির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না।
মাটিও যেন অক্ষত।
পুরোনো ইতিহাস
তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বাড়িটির পুরোনো নথি ঘেঁটে একটি অদ্ভুত তথ্য জানতে পারল।
১৯৭১ সালে বাড়িটির মালিক ছিলেন একজন হিন্দু মৃৎশিল্পী। যুদ্ধের সময় তার পরিবার ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়। তার মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে কোনোভাবে সে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।
কিন্তু সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার মানসিক অবস্থাকে ভেঙে দেয়।
কিছুদিন পর তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের মতে, মৃত্যুর আগে সে নিজের হাতে একটি কালো মূর্তি তৈরি করেছিল।
মূর্তিটির ভেতর সে নিজের সমস্ত ভয়, কষ্ট ও স্মৃতিকে বন্দি করে রাখার কথা বলত।
রাকিব গল্পটি শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
সে জানত না, মূর্তিটির সঙ্গে সত্যিই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা জড়িত কি না।
সত্যিই কি অতিপ্রাকৃত?
রাকিব শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি প্রকাশ করেনি।
তার কাছে ঘটনাটির কিছু অংশের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছিল, আবার কিছু প্রশ্নের কোনো উত্তরও ছিল না।
একদিন ইমন তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুই ভিডিওটা প্রকাশ করলি না কেন?”
রাকিব জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“সব সত্যি প্রকাশ করতে হয় না। কিছু রহস্য মানুষের মনে প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকাই ভালো।”
পরিত্যক্ত বাড়িটি আজও আছে।
কালো মূর্তিটিও দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গায়।
তবে এখন গ্রামের কেউ আর তার কাছে যায় না।
রাকিবের ব্লগে সেই ঘটনার বিষয়ে শুধু একটি বাক্য লেখা আছে—
“The truth is not always meant to be revealed.”
সমাপ্ত
📢 আপনার মতামত জানান:
কি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে? নিচে কমেন্ট করুন ও পোস্টটি শেয়ার করুন।