রহস্য-১, কালো মূর্তির রহস্য: এক নিখোঁজ সন্ধান ও অদৃশ্য আতঙ্ক

 

কালো মূর্তির রহস্য: এক নিখোঁজ সন্ধান ও অদৃশ্য আতঙ্ক

ক্যাটাগরি: রহস্য গল্প

ঢাকার অদূরে একটি পুরোনো গ্রাম। দিনের আলোয় গ্রামটি আর দশটি গ্রামের মতোই স্বাভাবিক—সবুজ মাঠ, সরু মেঠোপথ, নদীর বাতাস আর মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর থেকেই যেন বদলে যেতে থাকে চারপাশের পরিবেশ। পথঘাট ক্রমশ নির্জন হয়ে আসে, কুকুরের ডাক থেমে যায়, আর গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত বাড়িটিকে ঘিরে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা।

বাড়িটির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পাথরের একটি মূর্তি।

গ্রামের প্রবীণদের বিশ্বাস, মূর্তিটির চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে অমঙ্গল ঘটে। কয়েক বছর আগে এক যুবক নাকি গভীর রাতে মূর্তিটির কাছে গিয়েছিল। পরদিন থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ বলত, সে পালিয়ে গেছে। কেউ বলত, বাড়িটির ভেতরে এমন কিছু আছে, যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।

কিন্তু এসব গল্পে বিশ্বাস করত না রাকিব।

রাকিব একজন তরুণ ব্লগার ও ইউটিউবার। রহস্যময় জায়গা, পুরোনো স্থাপনা এবং লোকমুখে প্রচলিত অদ্ভুত কাহিনি নিয়ে অনুসন্ধান করাই তার নেশা। গ্রামের এই গল্পটি শোনার পর তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

“একটা মূর্তির দিকে তাকালেই মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়?” হেসে বলল রাকিব। “এগুলো নিছক কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়।”

তার বন্ধু ইমন কিন্তু হাসল না।

“তুই বিশ্বাস করিস না, সেটা তোর ব্যাপার,” নিচু গলায় বলল সে। “কিন্তু আমার খালাতো ভাই ওই বাড়িতে গিয়েছিল। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

রাকিবের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

“পুলিশ খোঁজ করেনি?”

“করেছিল। আশপাশের সব জায়গা খুঁজেও কোনো সন্ধান পায়নি। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যাওয়ার আগে সে বাড়িটার কথা বলেছিল। বলেছিল, সেখানে এমন কিছু দেখেছে, যা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।”

কথাটা রাকিবের মনে গেঁথে গেল।

সেদিন রাতেই সে পরিত্যক্ত বাড়িটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

রহস্যের শুরু

রাত তখন প্রায় এগারোটা।

আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ। গ্রামের শেষ প্রান্তের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে রাকিব ও ইমন। রাকিবের হাতে ক্যামেরা, আর ইমনের হাতে একটি টর্চলাইট।

বাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছাতেই রাকিবের মনে হলো, চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই, গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ নেই। শুধু নিজেদের পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ আওয়াজ।

“কী অদ্ভুত নীরবতা!” ফিসফিস করে বলল রাকিব।

ইমন কোনো উত্তর দিল না।

পরিত্যক্ত বাড়িটির ভাঙা ফটক পেরিয়ে তারা উঠোনে প্রবেশ করল। দেয়ালে শ্যাওলা, জানালার পাল্লা ভাঙা, আর ছাদের কয়েকটি অংশ ধসে পড়েছে। উঠোনের মাঝখানে কালো পাথরের মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে—নড়াচড়া নেই, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তবু ক্ষীণ চাঁদের আলোয় সেটিকে অস্বাভাবিক রকম জীবন্ত মনে হচ্ছিল।

রাকিব ক্যামেরা তুলে মূর্তিটির ছবি নিতে গেল।

ঠিক তখনই ইমন তার হাত চেপে ধরল।

“ওদিকে দেখ!”

মূর্তিটির পেছনে মাটির একটি অংশ অন্য জায়গার তুলনায় কিছুটা উঁচু। পাশে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি ভেজা মাটির দলা। দেখে মনে হয়, সম্প্রতি কেউ সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করেছে।

রাকিব নিচু হয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করতে গেল। কিন্তু মাটির কাছে পৌঁছানোর আগেই তার কানে ভেসে এল একটি ক্ষীণ কণ্ঠস্বর—

“ফিরে যাও...”

সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“কে?” চিৎকার করে উঠল রাকিব।

কোনো উত্তর এল না।

ইমন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

“তুইও শুনেছিস, তাই না?”

রাকিব কিছু বলার আগেই ক্যামেরার পর্দা ঝিলমিল করে নিভে গেল। ব্যাটারি পরীক্ষা করে সে দেখল, চার্জ থাকার কথা। তবু ক্যামেরা আর চালু হলো না।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” নিজের মনেই বলল সে।

হঠাৎ মূর্তিটির পেছনের অন্ধকারে যেন কারও ছায়া নড়ে উঠল।

রাকিব টর্চের আলো সেদিকে ফেলল।

কেউ নেই।

আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে রাজি হলো না ইমন। সে রাকিবের হাত ধরে টান দিল। দুজন দ্রুত বাড়ির উঠোন থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে ফিরে এল।

পেছনে ফেলে এল কালো মূর্তিটিকে।

কিন্তু রাকিবের মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের মধ্যে কেউ যেন তাদের চলে যাওয়া দেখছে।

পরদিন সকালের অদ্ভুত ফুটেজ

পরদিন সকালে রাকিব ক্যামেরাটি পরীক্ষা করতে বসল।

আগের রাতের রেকর্ডিং চালু করতেই সে হতাশ হলো। অধিকাংশ ভিডিওতেই শুধু কালো পর্দা। কোথাও বাড়ির উঠোন নেই, মূর্তি নেই, এমনকি তাদের কথাবার্তাও স্পষ্ট নয়।

কিন্তু অডিওর একেবারে শেষ দিকে একটি শব্দ পাওয়া গেল।

টিক... টিক... টিক...

একটি ঘড়ির কাঁটার মতো শব্দ।

রাকিব বিস্মিত হলো। পরিত্যক্ত বাড়িটিতে তো কোনো ঘড়ি থাকার কথা নয়। তাছাড়া রাতের বেলায় সে বা ইমন কেউই এমন শব্দ শোনেনি।

সে শব্দটির অংশ বারবার শুনতে লাগল।

হঠাৎ ভিডিওর শেষ কয়েক সেকেন্ডে একটি অস্পষ্ট অবয়ব চোখে পড়ল।

একজন নারী।

কালো পোশাক পরা অবয়বটি দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিটির ঠিক পেছনে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সে মাথা নিচু করে মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে আছে।

রাকিবের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ইমনকে ফোন করল।

ইমন এসে ভিডিওটি দেখার পর দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলল না।

“ওখানে তো কেউ ছিল না,” অবশেষে বলল সে। “আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না।”

রাকিব ভিডিওটি কয়েকবার পরীক্ষা করল। আলো, ছায়া কিংবা ক্যামেরার ত্রুটির কারণে এমন দৃশ্য তৈরি হতে পারে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা পেল না।

শেষ পর্যন্ত তারা ঘটনাটি পুলিশকে জানাল।

পুলিশ বাড়িটিতে গিয়ে উঠোন ও আশপাশের জায়গা পরীক্ষা করল। কিন্তু মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ির কোনো স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেল না। আগের রাতে যে জায়গাটি অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল, সেটিও অন্য মাটির মতোই দেখাচ্ছিল।

পুলিশের ধারণা ছিল, অন্ধকারে ভুল দেখা, ভয় কিংবা ক্যামেরার প্রযুক্তিগত ত্রুটি থেকে ঘটনাটির কিছু অংশ ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

কিন্তু রাকিবের মনে প্রশ্ন থেকেই গেল—ভিডিওতে নারীর অবয়বটি এল কোথা থেকে?

অতীতের অন্ধকার অধ্যায়

ঘটনাটির পেছনের ইতিহাস জানার জন্য রাকিব গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। প্রথম দিকে কেউই স্পষ্ট কিছু বলতে চাইছিল না। কেউ বলল, এসব পুরোনো কথা ভুলে যাওয়াই ভালো। কেউ আবার জানাল, বাড়িটি নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা গল্প প্রচলিত।

অবশেষে গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি তাকে বাড়িটির মালিকের পরিবারের কথা বললেন।

এটি ছিল গল্পের কল্পিত প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক পুরোনো ইতিহাস।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বহু পূর্ব সময়ে বাড়িটির মালিক ছিলেন একজন হিন্দু মৃৎশিল্পী। তাঁর মেয়েটিও একদিন নিখোঁজ হয়ে যায়। এই ঘটনার পর সেই বৃদ্ধ মৃত্যু বরন করে। বহু আতঙ্ক ও দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার পর মা হারা মেয়েটি  শূন্য ভিটায় ফিরে এলেও আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

কিছুদিন পর মেয়েটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গ্রামের মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য ছিল না। তবে লোকমুখে প্রচলিত ছিল, মৃত্যুর আগে সে কালো পাথরের মতো দেখতে একটি মূর্তি তৈরি করেছিল। মূর্তিটি বানানোর সময় সে নাকি বারবার বলত, মানুষের মনের ভয়, দুঃখ আর স্মৃতি যদি কোথাও বন্দি করে রাখা যেত, তাহলে হয়তো মানুষ অতীতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কথাগুলো বদলে যায়। মানুষের মুখে মুখে মূর্তিটি হয়ে ওঠে অভিশপ্ত। কেউ বলত, মেয়েটির আত্মা মূর্তির মধ্যে বন্দি। কেউ বলত, মূর্তিটি আসলে মানুষের অপরাধবোধ ও ভয়কে মনে করিয়ে দেওয়ার একটি প্রতীক।

মেয়েটি মৃত্যুবরণের পর জনশূন্য বাড়িটি পরিত্যক্ত অপয়া বাড়িতে পরিণত হয়।

কোন কথাটি সত্য, তা কেউ জানত না।

রাকিব বাড়িটির ইতিহাস শুনে চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, একটি রহস্যময় মূর্তিকে ঘিরে মানুষের ভয় যতটা, তার চেয়েও গভীরে রয়েছে একটি পরিবারের বেদনার গল্প।

কিন্তু সেই রাতের অদ্ভুত শব্দ আর ক্যামেরায় ধরা পড়া অবয়বের ব্যাখ্যা কি এই ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল?

নাকি সবকিছুর পেছনে ছিল অন্য কোনো সত্য?

সত্যিই কি অতিপ্রাকৃত?

পরবর্তী কয়েক দিন রাকিব ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করল। সে প্রযুক্তিগত ত্রুটির সম্ভাবনা যাচাই করার চেষ্টা করল। অডিওর শব্দটিও বিশ্লেষণ করল। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর পেল না।

সবচেয়ে বেশি তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল একটি বিষয়—ভিডিওতে দেখা নারীর অবয়বটি।

সে জানত, অস্পষ্ট ছবি দেখে কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আলো, ছায়া, ক্যামেরার ত্রুটি কিংবা মানুষের চোখের ভুলও অনেক সময় অদ্ভুত অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

তবু সেদিন রাতের অনুভূতিটা সে ভুলতে পারছিল না।

একদিন ইমন তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই ভিডিওটা প্রকাশ করলি না কেন? এত দিন ধরে তো এমন একটা রহস্যের খোঁজেই ছিলি।”

রাকিব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূরে সন্ধ্যা নামছে। আকাশের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

“আমি জানি না, ওই রাতে আমরা ঠিক কী দেখেছিলাম,” সে বলল। “কিন্তু একটা বিষয় বুঝেছি—সব রহস্যের উত্তর না জেনেই কোনো গল্পকে সত্যি বলে প্রচার করা ঠিক নয়। আর কিছু ঘটনার পেছনে মানুষের ভয়, দুঃখ আর অতীতের যন্ত্রণা থাকে। সেগুলোকে শুধু ভৌতিক বিনোদনে পরিণত করতে চাই না।”

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“তাহলে তোর অনুসন্ধানের ফল কী?”

রাকিব মৃদু হেসে বলল, “সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কিন্তু কিছু প্রশ্ন আমাদের ভাবতে শেখায়।”

সে ভিডিওটি প্রকাশ করল না।

পরিত্যক্ত বাড়িটি আজও গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কালো মূর্তিটিও আছে উঠোনের মাঝখানে। দিনের আলোয় সেটিকে একটি পুরোনো পাথরের ভাস্কর্য ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

তবু সন্ধ্যার পর গ্রামের মানুষ বাড়িটির পাশের পথ এড়িয়ে চলে।

রাকিব তার ব্লগে সেই ঘটনার বিষয়ে একটি ছোট্ট নোট লিখে রেখেছে—

“কোনো রহস্যের ব্যাখ্যা আমরা জানি না বলেই সেটি অলৌকিক হয়ে যায় না। কখনো কখনো অজানার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান করা—আর মানুষের বেদনার প্রতি সম্মান রাখা।”

কিন্তু সেই রাতের রেকর্ডিংয়ের শেষ অংশে শোনা ঘড়ির টিকটিক শব্দটি আজও রাকিবের মনে পড়ে।

কারণ, পরিত্যক্ত বাড়িটিতে কোনো ঘড়ি থাকার কথা ছিল না।

সমাপ্ত।


আপনার মতামত জানান: গল্পটির কোন অংশটি আপনার কাছে সবচেয়ে রহস্যময় মনে হয়েছে? আপনার ভাবনা কমেন্টে লিখুন। গল্পটি ভালো লাগলে আগ্রহী পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন