আমার জন্মতারিখের গল্প: একটি ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘ স্মৃতি /অতীতস্মরণ

আমার জন্মতারিখের গল্প: একটি ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘ স্মৃতি

অতীতস্মরণ

 নিজের জন্মতারিখ পরিবর্তনের একটি বাস্তব জীবনের স্মৃতিচারণ। ১৯৮০ সালের স্কুলজীবন, রেজিস্ট্রেশন, সরকারি চাকরির চিন্তা এবং সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘ প্রভাবের গল্প।

 

বয়স ষাটের পথে। শরীর আর আগের মতো টগবগ করে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি অদ্ভুত বিষয় ঘটেছে—বর্তমানের কোনো ঘটনা হঠাৎ করে অতীতের কোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।

তখন মনে হয়, এই ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের কোনো পুরোনো ঘটনার কি মিল আছে? বহু বছর আগে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম কি না?

সেই পুরোনো ঘটনাগুলো মনে করা, নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ থেকেই আমার কাছে অতীতস্মরণ বা Flashback।

হয়তো অতীতের এসব কথা ঘেঁটে কারও বড় কোনো লাভ হবে না। কিন্তু ক্ষতিও তো নেই। আর যদি কোনো পাঠক সামান্য আনন্দ পান, কিছু ভাবেন অথবা নিজের জীবনের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পান—তাহলেই লেখকের প্রাপ্তি।

আজ এমনই একটি স্মৃতি মনে পড়ল—আমার জন্মতারিখের গল্প।


একটি ভিডিও এবং পুরোনো স্মৃতির দরজা

সম্প্রতি মনিটরের সামনে বসে ইন্টারনেটে ইউটিউব দেখছিলাম। হঠাৎ একটি ভিডিও ক্লিপ সামনে এল। সেখানে বাংলাদেশের মানুষের জন্মতারিখ নিয়ে একটি কথা বলা হচ্ছিল।

কথাটি শুনে আমার নিজের জন্মতারিখের কথা মনে পড়ে গেল।

আমার প্রকৃত জন্মদিন ৬ নভেম্বর। কিন্তু আমার বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্রে জন্মতারিখ হিসেবে রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৬৭।

এই দুটি তারিখের পার্থক্য আমার জীবনের একটি দীর্ঘ গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।


কীভাবে বদলে গেল আমার জন্মতারিখ?

ঘটনাটি ১৯৮০ সালের।

আমি তখন নবম শ্রেণিতে উঠেছি। সেই সময় বিজ্ঞান বিভাগ নেওয়ার সুযোগ পেলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল, বিজ্ঞান পড়লে ভবিষ্যতে হয়তো ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব।

তখন অবশ্য ভাবিনি, জীবনে পেশার পথ শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও অনেক পেশা আছে—শিল্পী, পাইলট, নাবিক, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বারসহ নানা ধরনের কাজ।

কিন্তু সেই বয়সে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এত কিছু বোঝার সুযোগ কোথায়!

তাই শুরু হলো আমার বিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা।

পরিবার ও পরিচিতদের কাছ থেকেও তখন এক ধরনের সম্মান পাওয়া যেত। মানুষ বলত, “হোসেন সাহেবের ছেলে মেধাবী, সায়েন্স নিয়েছে।”

কিন্তু খুব দ্রুতই বুঝতে পারলাম, শুধু মেধা থাকলেই হয় না—পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থেরও প্রয়োজন হয়।

 


রেজিস্ট্রেশনের সেই দিন

অষ্টম শ্রেণির তুলনায় নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞানের পড়াশোনা অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেল। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো বিষয় সামনে এলো।

এসব বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করতে শিক্ষকের অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তখন পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব স্বচ্ছল ছিল না।

ঠিক সেই সময় একদিন আমাদের ক্লাস টিচার জানালেন, পরদিন সবার রেজিস্ট্রেশন হবে।

আমরা জিজ্ঞেস করলাম—

“স্যার, কিসের রেডি? কোনো টাকা-পয়সা লাগবে?”

সরকারি স্কুলে পড়তাম। তখন বেতন ও টিফিনের জন্য সামান্য টাকা দিতে হতো। তাই টাকা-পয়সার কথা শুনলেই আমাদের মাথায় চিন্তা ঢুকে যেত।

স্যার বললেন, টাকা লাগবে না। তবে সবাইকে নিজের জন্মতারিখ জেনে আসতে হবে।

কারণ স্কুলের রেজিস্ট্রেশনে দেওয়া জন্মতারিখ পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


যে সিদ্ধান্তটি তখন যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল

পরদিন স্কুলে গিয়ে আমরা কয়েকজন শিক্ষককে একসঙ্গে পেলাম।

তখন আমাদের বোঝানো হলো, রেজিস্ট্রেশনে যে বয়স দেওয়া হবে, ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির বয়স হিসাবের ক্ষেত্রে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আমি তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব করতে শুরু করলাম।

আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ছিল ৬ নভেম্বর ১৯৬৪—এটাই আমার স্মৃতিতে থাকা জন্মতারিখ।

কিন্তু ভবিষ্যতে পড়াশোনায় সময় বেশি লাগলে সরকারি চাকরির বয়সসীমার সমস্যা হতে পারে—এমন চিন্তা তখন মাথায় এলো।

তাই নিজের বয়সের হিসাব করতে গিয়ে আমি জন্মতারিখ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

শেষ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনে লিখলাম—

১ জানুয়ারি ১৯৬৭।

তখন মনে হয়েছিল, এতে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির বয়সসীমার মধ্যে থাকার সুবিধা হবে।

সিদ্ধান্তটি তখন হয়তো আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যৎ যে অন্যরকম হতে পারে, তা তখন বুঝিনি।





ভবিষ্যৎ নিজের মতো করে চলে

জীবন সবসময় আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

সরকারি চাকরিতে যাওয়া হলো না।

আর্মিতে কমিশন র‍্যাঙ্কে চাকরি করার কথা ভেবেছিলাম। পরে কঠোরতা ও অন্যান্য বিষয় দেখে সেই চিন্তা বাদ দিলাম।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু সাঁতার না জানা এবং সমুদ্রে গিয়ে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কার কারণে সেটিও আর হলো না।

বিসিএস দেওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু গ্রামে গিয়ে কাজ করার বিষয়টি পছন্দ না হওয়ায় সেই পথেও যাওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে প্রাইভেট চাকরি করেছি, ব্যবসা করেছি, বাণিজ্য করেছি। সেখানে জন্মতারিখের চেয়ে যোগ্যতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অর্থাৎ যে সরকারি চাকরির বয়সসীমা মাথায় রেখে জন্মতারিখ পরিবর্তন করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত সেই সরকারি চাকরিই আর করা হলো না।


ভুলটি থেকে গেল সারাজীবন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্মতারিখের পরিবর্তনটি আর ছোট কোনো বিষয় রইল না।

এসএসসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্রে যে জন্মতারিখ চলে এসেছে, পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টসহ অন্যান্য নথিতেও সেটিই ব্যবহার করতে হয়েছে।

চাইলেই আবার পরিবর্তন করা সহজ নয়। নানা ধরনের প্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

তাই শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তিত জন্মতারিখ নিয়েই চলছি।

আমার নিজের স্মৃতিতে একটি তারিখ, আর সরকারি কাগজপত্রে আরেকটি তারিখ—এই দ্বৈততা আমার জীবনের একটি অদ্ভুত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


নিজের জন্মদিন নিজেই পালন করি

আজও যখন নিজের জন্মদিনের কথা মনে পড়ে, তখন একটি মজার সমস্যার মুখোমুখি হই।

আমি নিজের প্রকৃত জন্মদিন মনে রাখি ৬ নভেম্বর হিসেবে। কিন্তু কাগজপত্রের জন্মতারিখ হলো ১ জানুয়ারি ১৯৬৭।

তাই নিজের জন্মদিন কখনো কখনো নীরবে পালন করি।

কেউ যদি প্রশ্ন করেন—

“আপনার জন্মদিন তো ১ জানুয়ারি, তাই না?”

তখন মনে মনে সেই পুরোনো গল্পের কথা মনে পড়ে যায়।


একটি ভুল সিদ্ধান্তের শিক্ষা

আজ এত বছর পর পেছনে তাকালে মনে হয়, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু সেই মুহূর্তের সুবিধার কথা চিন্তা করলেই হয় না।

ভবিষ্যৎ আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী নাও চলতে পারে।

একসময় সরকারি চাকরির বয়সসীমা নিয়ে যে চিন্তা থেকে জন্মতারিখ পরিবর্তন করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিই করা হলো না।

জীবন নিজের গতিতে এগিয়েছে।

তাই আজ মনে হয়—জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিণতিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।


শেষ কথা

আমার জন্মতারিখের এই গল্প হয়তো খুব বড় কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এটি আমার জীবনের একটি সত্য অভিজ্ঞতা।

একটি ছোট সিদ্ধান্ত কীভাবে বহু বছর ধরে একজন মানুষের সঙ্গে থেকে যেতে পারে—এই গল্প তারই একটি উদাহরণ।

ভবিষ্যতে যদি কখনো নিজের জীবনের গল্প লিখি, তখন কোন জন্মতারিখটি লিখব—সেটি হয়তো আবার একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

একটি তারিখ আমার স্মৃতিতে, আরেকটি আমার সরকারি পরিচয়ে।

শেষ পর্যন্ত সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তিনি যা ভালো মনে করেন, সেটিই হয়।

— অতীতাস্মরণ থেকে আজকের এই স্মৃতি।




Focus Keyword:
জন্মতারিখের গল্প



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন