জন্মের ঠিক নেই ,
জন্মের ঠিক নেই এটা একটা গালি বা অশ্লীল বাক্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কখন যে, নিজের অজান্তে মানুষ এর শিকার হয় তার জলজেন্ত প্রমান আমি। ১৯৮০ সালে নবম শ্রেণীতে উঠেছি । সায়েন্স নিয়েছি যার বাংলা অর্থ বিজ্ঞান। এটা মেধাবী ছাত্ররা পড়ে। সেই দলে আমার নাম উঠেছে। ভুত ভবিষ্যত, সাত পাঁচ , ভালো মন্দ ,যোগ্যতা অযোগ্যতা ইত্যাদি কোনো কিছু না বুঝে না শুনে আমি বিজ্ঞানের দলে যোগ দিলাম। উদ্দেশ্য মনে মনে যে, ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবো। কিন্তু এটা মনে তখন আসেনি পেশা শুধু এই দুটোই নয় পেইন্টার , প্লাম্বার , ইলেক্ট্রিশিয়ান,পাইলট,নাবিক ইত্যাদি এইগুলোও পেশা। যাহোক শুরু করলাম বিজ্ঞান সাধনা যাত্রা। সবকিছু ভালো ছিল, ছিল সম্মান কারণ লোকে বলতো হোসেন সাহেবের ছেলে মেধাবী, সায়েন্স নিয়েছে। কিন্তু গোল বাধালো অর্থ। একটা গানে শুনেছিলাম "টাকা দেখতে গোল, থাকলে গোল, না থাকলেও গন্ডগোল। " গোল টাকার মূল্য পূর্বে থাকলেও এখন নাই বললেই চলে কারণ এখন কাগজের চারকোনা টাকার বড় নোটটাই বহু পরিমানে না থাকলে মূল্যহীন হয়ে পরে মানুষ। কথা উঠতে পারে বিজ্ঞানের সাথে অর্থ আবার আসলো কেন?
কারণটা সাধারণ,অষ্টম শ্রেণীতে ইলেক্টিভ ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি,বায়োলজি ছিল না। এগুলো এসে জুড়লো নবম শ্রেণীর বিজ্ঞানে, আর এগুলো আয়ত্ব করতে প্রয়োজন উস্তাদের সহায়তা কিন্তু তখন পিতার আর্থিক অবস্থায় চলছে অনটন। এসব নিয়ে যখন চিন্তা ভাবনায় ত্রাহি অবস্থা সেই সময় ক্লাস টিচার পাঠান স্যার বললো,
"এই শোন , আগামীকাল তোদের সবার রেজিস্ট্রেশন হবে। তোরা সবাই রেডি থাকিস। "
উনি কোনো পাঠান বংশের না। বাড়ি এদেশেই। মুষ্টি মতো চাপ দাড়ি আছে। ঢাকা গভঃ মুসলিম হাই স্কুল এর অনেক টিচারের দাড়ি আছে, তাই সেটা কোনো বড় ব্যাপার না বড় ব্যাপার হলো উনি কাবুলি ড্রেস পড়েন এবং মাথায় প্রায়শই পাগড়ি পড়েন। তাই সিরাজুল ইসলাম নাম হওয়া সত্বেও ওনাকে সবাই পাঠান স্যার হিসেবেই চিনেন। আর নামটা যে ওনার সাথে মানানসই তা ওনার সাথে আমার প্রথম দর্শনেই আমি বুজতে পারি। আমার প্রথম ক্লাস সেভেনে ভর্তি হওয়া, কমন রুমে এক অনুষ্ঠানে ছাত্ররা সব ফ্লোরে মাটিতে চাদরের উপর বসা। এই রুমে আমরা টেবিল টেনিস খেলতাম সেই টেবিলটা এক কোনে সাইড করে রাখা, টেবিলের এই পাশের কিছু ছাত্র শোরগোল করছিলো স্যার জাম্প করে টেবিলের উপর দিয়ে দৌড়িয়ে সেই ছাত্রদের পাশে এসে একটা ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে ধমক দিলো যা আমি বহু বছর পরে অমিতাভের খুদা গাওয়া ছবির অ্যাকশন সীনে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি দুর্বল কণ্ঠে পাশের সহপাঠীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
"উনি কে?"
তার উত্তর ছিলো ,
"পাঠান স্যার। "
যাহোক প্রসঙ্গে আসি। আমরা সবাই জিজ্ঞেস করলাম,
"কেন স্যার, কিসের রেডি , কোনো টাকা পয়সা লাগবে নাকি?"
সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ি। বেতন শুরু হয়েছিল ৫টাকা টিফিন ৭টাকা মোট ১২ টাকা দিয়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে বেতন ৫ টাকা টিফিন ১০ টাকা মোট ১৫ টাকা। কোনো টাকার কথা বললে আমাদের মাথায় বাজ ভেঙে পরে।
স্যার বললো,
" টাকা পয়সা লাগবে না। জন্ম তারিখ জেনে আসবি। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া তোদের সারা জীবনের সাধনা এস,এস,সি পরীক্ষা দিতে পারবিনা। "
.png)
পরদিন যথারীতি স্কুলে গিয়ে পৌঁছানোর পর আমাদেরকে ক্লাসে না বসিয়ে নিচের তলার একটি কামড়ায় বসানো হলো যেখানে প্রাক্তন ছাত্ররা মিটিং করে, আড্ডা দেয়। ক্লাস টিচার পাঠান স্যার, দশম শ্রেণীর বিজ্ঞানের ক্লাস টিচার আবুল হোসেন স্যার, বিজ্ঞান টিচার রশিদ স্যার, শহীদুল্লাহ স্যার সবাই একে একে রুমের মধ্যে হাজির হলো। এতগুলো মেইন মেইন স্যার কে দেখে আমাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল কি ব্যাপার কি ঘটতে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি, যা হোক রশিদ স্যার প্রথমে শুরু করলেন,
" এখন যে কাজটা তোমরা করতে যাচ্ছ এটাই তোমাদের সারা জীবনের হিসেবের মধ্যে থাকবে এখন রেজিস্ট্রেশনের মধ্যে তোমরা যে বয়সটা যুক্ত করবে সেই বয়সটা দিয়েই তোমরা সরকারি চাকরি নেবে, বয়সটা যদি পার হয়ে যায় তাই হিসেব করে একটু কমিয়ে দিবে যাতে তোমাদের বয়স সরকারি চাকরির সীমার মধ্যে থাকে যখন তোমরা মাস্টার্স কমপ্লিট করবে, তখন যেন তোমাদের বয়স চাকরি সীমানার বাইরে না চলে যায়। "
আমার বয়স ৬ /১১/ ১৯৬৪ ঈসায়ী এই বয়সে ধরে হিসাব করে দেখতে পেলাম চাকরির সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, যদি, সেশন জট এ পড়ি। তাই আঙুল দিয়ে হিসাব শুরু করলাম আর এই হিসাবের সুবিধার্থে জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ বেছে নিলাম। সবকিছু বাছ বিচার করে ১/ ১/ ১৯৬৭ লিখলাম যাতে মনে হল বিসিএস ক্যাডার কিংবা সরকারি যেকোনো চাকরি কিংবা কোন ব্যাংকে চাকরি ইজিলি ২-১ বছর লস হলেও পেয়ে যাব, আমি শুধু না আমার মত অনেকেই এই রাস্তা ধরেই হাঁটলো, তাতে তাদের রাশিচক্র পাল্টিয়ে গেল ।আমি আজ পর্যন্ত জানিনা জানুয়ারিতে জন্ম নিলে আমার কোন রাশি? কারণ আমি জন্মগতভাবে বৃশ্চিক রাশির জাতক, রাশি নিয়েও আমি তেমন কোন চিন্তিত না কিন্তু জন্ম যে পরিবর্তন হয়ে গেল জন্ম যে বেঠিক হয়ে গেল তা নিয়ে ভবিষ্যতে বহু অসুবিধা এবং চিন্তার মধ্যে পড়লাম, জন্মের ঠিক নেই কথাটা ঠিক না জন্ম তারিখের ঠিক নেই যেটা নিজের হাত দিয়ে নিজেই করলাম। ভবিষ্যতের চিন্তা করলাম না, তখনই যে চিন্তাটা সামনে আসলো কিভাবে সরকারি চাকরি পাব , অথচ আজকে ৬০ বছর পার করে কোন সরকারি চাকরি করা হলো না। আর্মিতে চাকরি করতে চাইলাম কমিশন রেঙ্কে। সেখানের সমস্যা দেখে, কঠোরতা দেখে, বাদ দিলাম। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম। সাঁতার জানিনা সমুদ্রে গেলে নাকি প্রচন্ড বমি হয় তাই সেটা বাদ দিলাম। বি সি এস দিতে চেয়েছিলাম সেটাও বাদ দিলাম গ্রামে যেতে হবে বলে। প্রাইভেট চাকরি করেছি যেখানে বয়সের তেমন একটা প্রয়োজন ছিল না যোগ্যতাটাই সবকিছু। ব্যবসা করলাম বাণিজ্য করলাম সরকারি চাকরি আর নেওয়া হলো না, অথচ মধ্য দিয়ে বয়সটাই পরিবর্তিত হয়ে গেল। হায়রে কপাল, হায়রে বিধি, জাতীয় পরিচয় পত্রে এস এস সিতে যে ডেট অফ বার্থ তার সেই হিসাবে দিতে হলো। যদি পাল্টাতে চাই এফিডেভিট করতে হবে নানান সমস্যা তার থেকে বাঁচতে গিয়ে সেই জন্ম তারিখ টাই নিয়ে এখন পথ চলছি।
![]() |
| Date of birth |
নিজের জন্মদিন করি কিন্তু সবাই বলে পহেলা জানুয়ারি না? তাই নিজেই গোপনে করি কাউকে জানাই না বর্তমানে বার্থ সার্টিফিকেটের প্রচলন হয়েছে সেটার মধ্যেও আমার ১/ ১/ ১৯৬৭। ভবিষ্যতে যদি কখনো জীবনী লেখাও হয় সেখানে কি তারিখ দিব? জন্মের ঠিক নেই বা জন্ম তারিখের ঠিক নেই এই সমস্যা থেকে কি আর উত্তরিত হতে পারব না ? আল্লাহ মালিক তিনিই সব ভালো জানেন।
.png)