ভারত ভ্রমণ ৯১ / India Travel 91: চাঁদনী চক ও লালকিল্লা দর্শন
![]() |
| আরো জানতে চাইলে পড়ুন |
১০
পরদিন সকালে মহিষের পায়া আর রুটি দিয়ে নাস্তা সারলো আগেই পূর্বের বাড়িওয়ালার ছেলে এসে হাজির,তাকে নিয়েই নাস্তা সারা হলো। ওল্ড দিল্লি থেকে বাসে নিজামুদ্দিন রওয়ানা দিলো ওরা। নিজামুদ্দিনের দুইটা ভাগ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারের এক পাশে ধনীদের আবাস স্থল আর মধ্যে মধ্য বৃত্ত নিম্ন বৃত্তদের বস্তি নিজামুদ্দিন। পুরোটাই মুসলিম এলাকা। বস্তি নিজনিজামুদ্দিনে কোনো রিকশা গাড়ি চলে না। নিজামুদ্দিনের নতুন বাড়ি ঘরগুলোতে ঢুকতে যে বড় রাস্তা সেখানে বাস টেক্সি সবই আছে। দিল্লির সব প্রান্তেই এখন থেকে যাওয়া যায়। তানভীরের মামার বাড়িতে বস্তি নিজামুদ্দিনে বাসে পোনে এক ঘন্টার মধ্যে পৌঁছলো ওরা ।
মামা যেখানে ভাড়া থাকে,সেটা বাংলাদেশের পুরাতন ঢাকার মতো এলাকা দেড় তলা বাড়ি , তবে পুরো এলাকায় মোঘল আমলের ছাপ। ছোট্ট একটা গেট দিয়ে ঢুকলাম,সিমেন্টের প্যাসেজ ভাঙাচোরা প্রায় কিন্তু ঘরগুলো টাইলস করা তাও মার্বেলের। আমাদের দেশে এই মার্বেল দামি মসজিদের ফ্লোরে ব্যবহার করে, আমিন নিশ্চিত হলো ওখানে মার্বেল সস্তা। নাহলে এরকম বস্তি বাড়িতে এই মার্বেল ব্যবহার করা যেতোনা। বাড়িটা পুরোনো , এক সময় এর মালিক সালাউদ্দিন সাহেব ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। তার দুই মেয়ে পারভীন বড় তারপরে রাখি এরপরে ছেলে গুড্ডু। গুড্ডুর বয়স ১২ রাখি ১৪ আর পারভীন ১৫.মেয়ে দুজন সুন্দর হালকা পাতলা গুড্ডু বোনদের ও পিতার মতো পাতলা না আর মায়ের মতো মোটা না। এই পরিবারের আশ্চর্য বিষয় হলো গুড্ডুর পিত ৪৫কেজি, গুড্ডুর মা রাখী ১৪৫ কেজি।রাখীর মুখ গোলগাল,ফর্সা গায়ের রং। সালাউদ্দিন সাহেব ফর্সা পাতলা ঠিক যেন আমাদের দেশের পুরোনো আমলের চার্লি রবিউলের মতন। ওনাদের সাথে কথা বলে আমিনদের মাথায় আরেকটা বাজে পড়লো, তানভীরের মামা গতকাল সকালে বেড়াতে বাংলাদেশে চলে গিয়েছে।
![]() |
| আরো জানতে চাইলে পড়ুন |
১১
আমিনরা যখন মামাকে না পেলে কি করবে কি করবে না সামনের দিনগুলির ভবিষ্যত কি এই চিন্তায় মগ্ন তখন পুরোনো বাড়িওয়ালার ছেলে নাওয়াজ সালাহউদ্দিন সাহেবের সাথে আস্তে আস্তে হিন্দিতে কিছু বলছে আমিন ভি সি আরে হিন্দি সিনেমা দেখে কথা কম বলতে পারলেও বুঝতে একদম পাকা।
অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে শুনতে পেলো,
পুরোনো বাড়িওয়ালার ছেলে নওয়াজ সালাউদ্দিন সাহেবকে বলছে,
"চাচাজি ইয়ে লোক বহুত দূর মুলুক বাংলাদেশছে আয়া , ইনকো মামাকে সাথ কন্টাক নেহি হুয়া , রেহানে কি জায়গা নেহি মিলা তো উস্কো বহুত প্রব্লেম হোগা। কুচ কিজিয়ে ".
সালাউদ্দিন সাহেব বললেন ,
"কোই প্রব্লেম নেহি , উস লোক উস মামাজী কে ঘর্মে থাকনেসে হামারা কেয়া প্রব্লেম, হামারা পাস চাবি হেয়। "
কথাটা শুনে আমিনদের মন প্রফুল্ল হয়ে গেলো।
দোতালায় ছাদের সাথে কয়েকটি ঘর তার মধ্যে একটি তানভীরের মামার। তালা খোলার পর দেখা গেলো সুন্দর পরিপাটি একটি ঘর। লক করা আলমারি যার চাবি বাড়িওয়ালার কাছে নেই , আমিনদের প্রয়োজনও নেই। একটি আলনা যেখানে গামছা লুঙ্গি সবই আছে। একটা টেবিল আছে যেখানে খাতা কলম সাবান সেম্পু সবই রাখা আছে , যেগুলির প্রয়োজন ওদের আছে। একটি ডবল কিং সাইজের খাট আছে, যাতে ৪টি বালিশ,৪ টি লেপ আছে যা শীতের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।
আমিনরা রুমে ঢুকে ব্যাগগুলো টেবিলে রাখলো। সালাউদ্দিন সাহেব বললেন ,
"আপকো চাবি লিজিয়ে। "
আমিন এসেছে নিছক আজমীর শরীফ জেয়ারত করতে আর তানভীর এসেছে ইউরোপ আমেরিকার কোনো এক দেশের ভিসা নিতে। সেই সময় বাংলাদেশ থেকে অনেক দেশের ভিসা পাওয়া যেতোনা। তাই ভারতে আসতে হতো। তানভীর মামু ইংলিশে কথা বলায় কাঁচা এবং তেমন কোনো স্ট্যান্ডার্ড কাপড় চোপড় সাথে আনে নাই। তারপরেও সে পরের দিন থেকে তার মিশন শুরু করার কথা ঘোষণা করলো। তবে তারা একটু পরেই বেরিয়ে গেলো লাল কিল্লার উদ্দেশ্যে।
![]() |
| আরো জানতে চাইলে পড়ুন |
১২
তারা যেখান থেকে ভোরে এসেছিলো, বাসে সেখানেই চলে গেলো। চাঁদনী চকের পাশে জামা মসজিদ আর মোগল সম্রাট শাজাহানের প্রতিষ্ঠিত লাল কিল্লা , যা ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য একটা দর্শনীয় স্থান। যমুনা নদীর পশে ২ মাইল জায়গা নিয়ে সম্রাটের এই প্রসাদ তৈরী। চওড়া পাস বিশিষ্ট দেয়াল যাতে রক্ষীরা ঘোড়া নিয়ে টহল দিতে পারে। জাদুঘর , রঙমহল, মমতাজ মহল কি নেই তাতে। পাশের জামা মসজিদে নামাজ পড়ার পর আমিন ভাবলো , লালবাগের কিল্লা যেহেতু এতো জাকজমক পূর্ণ সেখানে সম্রাটের প্রাসাদ তো আরো যাক জমক পূর্ণ হবে কারণ লালবাগ তো তার একজন সাধারন সুবেদারের প্রাসাদ। দুপুরে খাসির মনমাতানো বিরিয়ানী ও টকদইয়ের লাসসি দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা লাল কিল্লার আসে পাশেই ঘোরাফিরা করতে লাগলো।
ওদের এই দেরি করে ফিরার কারণ শুধু শুধুই ঘোরাঘুরি না, ওদের মনে এক বাসনা জেগেছে রাতে লাল কিল্লায় ওরা টিকেট কেটে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখবে। সারা বিকেল ঘোরাঘুরি করে আসর ও মাগরিবের নামাজ পরে নানরুটি ও মহিষের গোস্ত ( দিল্লিতে কলকাতার মতো গরুর গোস্ত পাওয়া যায়না , কলকাতার নিউ আমিনিয়া হোটেলের আশেপাশে সস্তায় গরুর গোস্ত পাওয়া যেত সেই সময়। এটা বাংলাদেশের ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের নির্বাচনের আগের ঘটনা। গোস্ত দিয়ে জমপেস খানা খেয়ে জামা মসজিদে ৭.৩০ এর এশার নামাজ পড়তে চলে গেলো ওরা । ৮.৩০ এ ওদের শো দেখার সময়। ৮.২৫ এ ওরা লালকিল্লার গেটে পৌছালো। শো এর জায়গা কম দুরুত্বে না , ওরা খোলা চত্বরে পৌঁছার পূর্বেই শো শুরু হয়ে গেলো। এই শোতে ভারতের সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। চত্বরটা এমন জায়গায় যেখান থেকে সব মহল ও দালান স্পষ্ট দেখা যায়। মুঘল সম্রাট বাবর থেকে ইতিহাস শুরু হয়। ভারতের আজাদীতে এসে তা থামে। যে মহল বা দালানে ঘটনা সেই দালানে আলো জ্বলে উঠে , সাউন্ড ও অভিনয়ের মাধ্যমে ঘটনা দুর্দান্ত ভাবে ফুটিয়ে তোলে। চাঁদনী চকে কি হতো, শেষ দিকের মুঘল সম্রাটদের আয়েশি জীবন, নাদির শাহের আক্রমণ, সবকিছু লুটে নেওয়া , বাহাদুর শাহ জাফরের সময় সিপাহী বিদ্রোহোও এখান থেকে বাদ যায় নাই।
একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা পার করে বাসে ওরা বস্তি নিজামুদ্দিন ফিরে এলো পরের দিন সকালে এম্বেসিতে যাওয়ার জন্য।
.png)

.png)