ভারত ভ্রমণ ৯১ :কোলকাতা গমন

 ভারত ভ্রমণ ৯১ :  কোলকাতা গমন

Click

বনগাঁ স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরে আমিন। ভারতের ট্রেন ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই আলাদা মনে হয় তার কাছে। ট্রেনের ভেতরে ভিন্ন ধরনের পোশাক পরা মানুষ, ভিন্ন ভাষা, এবং একধরনের বর্ণিল পরিবেশ দেখে সে অভিভূত হয়ে পড়ে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে সে ভাবে, এই পথ কি তার জীবনের কোনো নতুন দিগন্তের সূচনা করবে?

ট্রেনে ১০/ ১১ বছরের কিছু ছেলে ফুল বিক্রি করছিলো।তাদের হাতে রোজনীগন্ধার  স্টিক। আমিন ও তার  মামু জিজ্ঞেস করলো,

 " তোরা কোথা  থেকে এসেছিস"।

ওরা  বললো,

 "বাংলাদেশ থেকে এসেছি।" 

আমিন শুনে অবাক হলো। বললো

 "তোরা এখানে এসে এই কাজ কেন করছিস"। 

উত্তর দিলো, 

"বাবা জেঠারা ভিটে মাটি জমি জিরাত বিক্রি করে আমাদের  এখানে নিয়ে এসেছে।"

 আমিন বললো,

" এখানে কি ভালো আছিস?"

 ওরা বললো,

' না দাদা, আগে স্কুলে পড়তাম এখন ট্রেনে ট্রেনে ফুল বিক্রি করি।"

 আমিনের একটা ঘটনা মনে পড়লো, তাদের দেশের এক হিন্দু সম্ভ্রান্ত লোক তার ভিটা জমি বিক্রি করে ভারত চলে এসেছে, লোকে বলছে সে নাকি খুব দূরবস্থায় আছে। আরো অনেকে নাকি এক জমি তিনবার বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি করে গোলমাল বাধিয়ে ভেগে গিয়েছে, তাদের আর দেশে ফেরার রাস্তা নেই।  তারা কি অবস্থায় আল্লাহ জানে, আছে তা নিয়ে আমিন ভাবতে লাগলো।





কলকাতায় পৌঁছে আমিনের প্রথম অভিজ্ঞতা হলো হাওড়া স্টেশন। স্টেশনের বিশালতা, হাজারো মানুষের ভিড়, আর আশপাশের চায়ের দোকানের গন্ধ তার কাছে নতুন এক জগৎ মনে হয়। সেদিনই সে বুঝতে পারে, কলকাতা যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং আধুনিকতা সব মিলেমিশে একাকার।

আমিনের ভ্রমণের পরবর্তী দিনগুলো ছিল কলকাতার অলিগলি ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে। তারা  ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যায়। প্রতিটি স্থানে তার মন যেন ইতিহাসের এক গভীর স্রোতে ডুবে যায়। কলকাতার কালীঘাট মন্দির দেখে তার মনে হয়, এই শহর শুধু মানুষের নয়, ধর্ম আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনের এক অসাধারণ উদাহরণ।আমিন ও তার মামা জাকারিয়া স্ট্রিটের আমিনিয়া হোটেলে উঠেছে।তাদের পরবর্তী গন্তব্য দিল্লী , দোকানে ডলার ভাঙিয়ে ডালহৌসি থেকে দিল্লীর কালকা মেইলের লম্বা জার্নিতে দুটি টিকেট আগেভাগেই কেটে রেখেছে।  

শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, কলকাতার খাবারও আমিনের মন জয় করে নেয়। রাস্তার ধারের ফুচকা, রসগোল্লা, আর বিখ্যাত কাঁচা গোলাপি পানির শরবত সে উপভোগ করে। তার মনে হয়, কলকাতার প্রতিটি কোণে যেন কোনো না কোনো গল্প লুকিয়ে আছে।


Read More:

আমিন এবং তার সমবয়সী মামা, তানভীর, দীর্ঘদিন ধরেই একসঙ্গে কোনো বড় অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। ছোটবেলা থেকে তারা দুজনই গল্পের বই পড়ে এবং সিনেমা দেখে একদিন ট্রেনের জানালা দিয়ে দেশ-বিদেশের দৃশ্য দেখবে বলে পরিকল্পনা করেছিল। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে এবার সিদ্ধান্ত হলো, একসঙ্গে দিল্লি যাওয়া হবে। বেছে নেওয়া হলো কালকা মেইল। মামা তানভীরের দিল্লি যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আরো একটা দিল্লির উওরোপিও এম্বেসি থেকে টুরিস্ট ভিসা জোগাড় করা। 




Read More:




দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি আগেভাগেই নেওয়া হয়। ট্রেনের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে ব্যাগ গোছানো, খাবার প্যাকিং—সবকিছু তানভীরের দায়িত্বে ছিল। আমিন যদিও একবারও ট্রেনে এত লম্বা যাত্রা করেনি, তবুও সে মনে মনে দারুণ রোমাঞ্চিত। তার কাছে ৪৮ ঘণ্টার এই ট্রেনযাত্রা ছিল এক বিশাল অভিযানের মতো।


যাত্রার দিন ভোরেই স্টেশনে পৌঁছে গেল দুজন। কালকা মেইল স্টেশনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই তাদের চোখে আনন্দের ঝিলিক। লাল-নীল রঙের বিশাল ট্রেনটি যেন এক চলমান শহর। প্ল্যাটফর্মে মানুষের কোলাহল, ট্রেনের হুইসেলের শব্দ, চা-ওয়ালার হাঁকডাক—সবকিছু যেন এক ছন্দের মতো শোনাচ্ছিল।

ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তারা নিজেদের সিটে গিয়ে বসল। জানালার পাশের সিট ছিল আমিনের। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দেখছিল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে থাকা স্টেশন, মানুষের ব্যস্ততা আর শহরের ভিড়। তানভীর ইতিমধ্যেই তাদের খাবার ও পানীয় সামগ্রী ঠিকঠাকভাবে রাখতে শুরু করেছিল।


থ্রি টায়ার রিজার্ভেশনের টিকেট কেটেছি আমিন রা। এটার অর্থ হলো ট্রেনের দুপাশে সিট্ একেক সিটে  তিনজন করে বসবে, রাতে ঘুমানোর সময় পিঠের হেলান দেওয়া সিটটা উঠিয়ে ওখানে একজন সহ তিন সিটে  তিনজন শুয়ে পড়বে , নিচে এক সিট্ , পিঠেরটা এক সিট্ এবং মাথার উপর একটা সিট্ আছে, অর্থাৎ তিনজন তিনজন করে দুপাশে ছয়জন ঘুমাবে। আবার সকালে পিঠের সিট্ উঠিয়ে তিনজন তিনজন করে এক পাশে বসবে।আমিনের এই বেবস্থা খুব ভালো লাগলো, দূরের জার্নি, যদি কেউ অসুস্থ বোধ করে তবে সে উপরের সিটে   উঠে ঘুমাতে পারবে। তানভীর এর নাম দিলো ট্রিপল সিটার।  কিন্তু ওরা বলে ট্রি টায়ার রিজারভেশন।  যাত্রার শুরুতেই তাদের ত্রিপল সিটের  পাশের যাত্রীরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। তাদের সঙ্গে দেখা হলো অরুণাভ দা এবং তার মেয়ে পায়েলের। অরুণাভ দা একজন শিক্ষক, আর পায়েল স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। পায়েলের হাতে ছিল একটি বই, যা দেখে আমিনের চোখ চকচক করে উঠল। বইয়ের নাম ছিল "অলিভার টুইস্ট"। পায়েলের সঙ্গে গল্প করতে করতে সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।




📢 আপনার মতামত জানান:
  কি   আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে? নিচে কমেন্ট করুন ও পোস্টটি শেয়ার করুন।









Post a Comment (0)
Previous Post Next Post